মাতামুহুরী নদীতে ডুবে পর্যটক নিখোঁজ, চলছে উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বান্দরবানের পাহাড়ি সৌন্দর্যের মাঝখানে অবস্থিত শান্ত-নির্জন প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ নদী মাতামুহুরী নদী। এই নদীর সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেই ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হয়েছেন এক তরুণ পর্যটক, যা স্থানীয় এলাকাসহ তার পরিবারে গভীর উদ্বেগ ও শোকের ছায়া ফেলেছে।

নিখোঁজ হওয়া তরুণের নাম আব্দুল ওয়াদুদ সায়েম, বয়স ২১ বছর। তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে তিনি এসেছিলেন বান্দরবানের লামা উপজেলার একটি পর্যটন এলাকায়। কিন্তু সেই ভ্রমণই পরিণত হয়েছে এক অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার ঘটনায়।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে লামা উপজেলা-এর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের মিনঝিরি এলাকায়। স্থানীয়ভাবে পরিচিত সাদাপাহাড়ের পাদদেশে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নামেন সায়েম ও তার পাঁচ বন্ধু। তারা দুপুরের দিকে একটি পর্যটনকেন্দ্রিক আবাসিক স্থানে পৌঁছে চেক-ইন করার পরই নদীতে নামেন। প্রথমে আনন্দঘন পরিবেশেই চলছিল তাদের সময় কাটানো, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নদীর একটি অংশে গভীর পানির উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্কতা জারি ছিল। সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট কর্তৃপক্ষও পর্যটকদের ওই অংশে না যাওয়ার জন্য লাল পতাকা টানিয়ে সতর্ক করেছিল। তবে আনন্দঘন পরিবেশে অসতর্কতাবশত সায়েম গভীর পানিতে চলে গেলে হঠাৎই তিনি তলিয়ে যান। তার বন্ধুরা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর দেখা যায়নি।

ঘটনার পরপরই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। কিন্তু নিজেরা ব্যর্থ হয়ে দ্রুত খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর একটি দল দুপুর দেড়টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নদীর স্রোত, গভীরতা এবং পাথুরে তলদেশের কারণে উদ্ধার অভিযান চালানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. আরাফাত জানিয়েছেন, তারা শুরু থেকেই পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। নদীর বিপজ্জনক অংশগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রবেশ না করার জন্য বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবুও অনেক সময় পর্যটকরা আনন্দের বশে সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেন, যা এমন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় প্রশাসনও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পুলিশ-এর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিখোঁজ পর্যটকের সন্ধানে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সায়েমের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নদী, পাহাড় ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যটকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা এবং নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিজেদেরও সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি নদীগুলো দেখতে শান্ত হলেও এর গভীরতা ও স্রোত অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। হঠাৎ গভীর গর্ত, পাথুরে তলদেশ এবং স্রোতের পরিবর্তন একজন অভিজ্ঞ সাঁতারুকেও বিপদে ফেলতে পারে। তাই এমন স্থানে নামার আগে স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনার মানবিক দিকটি আরও বেদনাদায়ক। পরিবার থেকে দূরে, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভ্রমণে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হওয়া একজন তরুণের জন্য যেমন দুর্ভাগ্যজনক, তেমনি তার পরিবারের জন্য এটি এক অসহনীয় সময়। পরিবারের সদস্যরা এখন উদ্বেগ আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যেন কোনোভাবে তার সন্ধান পাওয়া যায়।

বান্দরবানের মতো পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকায় প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তবে এর পাশাপাশি নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এমন দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, মাতামুহুরী নদীর এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে অসতর্কতা যেন প্রাণঘাতী না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। এখন সবার দৃষ্টি উদ্ধার অভিযানের দিকে, যেন দ্রুতই নিখোঁজ তরুণের সন্ধান পাওয়া যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত