চবিতে হামলা, সাংবাদিকের হাত ভাঙা—গ্রেফতার ২

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
চবিতে হামলা, সাংবাদিকের হাত ভাঙা—গ্রেফতার ২

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আবারও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে। স্থানীয়দের অতর্কিত হামলায় সময় টিভির ক্যাম্পাস প্রতিনিধি জাহিন সরকার আবিরসহ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। হামলার ঘটনায় আবিরের বাঁ হাত ভেঙে যাওয়ার মতো গুরুতর আঘাতের বিষয়টি এই ঘটনাকে আরও গভীরভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত দুই হামলাকারীকে গ্রেফতার করেছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

শুক্রবার রাত প্রায় ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট সংলগ্ন রেলক্রসিং এলাকার ইসলামিয়া হোটেলের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, ওই সময় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৬ থেকে ৭ জন শিক্ষার্থী খাওয়া শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা ৩ নম্বর রুটের একটি বাস আসতে দেখে কিছুটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন এবং বাসের দিকে এগিয়ে যান। এই স্বাভাবিক আচরণই হঠাৎ করে অস্বাভাবিক মোড় নেয়, যখন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ইমন নামে এক ব্যক্তি প্রথমে তাদের উদ্দেশে গালিগালাজ শুরু করেন এবং পরে নাঈম নামে আরেকজন এসে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলেন। মুহূর্তের মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় সময় টিভির ক্যাম্পাস প্রতিনিধি জাহিন সরকার আবির পুরো ঘটনাটি ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা আবিরের ফোন কেড়ে নেয় এবং কেন ভিডিও করা হচ্ছে সে প্রশ্ন তুলে তাকে মারধর শুরু করে।

আহত শিক্ষার্থী আলীমুল শামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, আবির নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে লাঠি দিয়ে তার হাতে সজোরে আঘাত করা হয়, যার ফলে তার বাঁ হাতের কনুইয়ের ওপর মারাত্মক আঘাত লাগে এবং পরবর্তীতে তা ভেঙে যায় বলে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন। এ সময় অন্য শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হন। চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন ফরহাদ, তৃতীয় বর্ষের আশিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হন।

ঘটনার পরপরই আহতদের উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গুরুতর আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. আবুল কাশেম জানান, আবিরের হাতে গুরুতর চোট লেগেছে এবং এক্স-রে ও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে আশিকুর রহমানের হাতের মাংসপেশিতে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এই হামলার ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতাদের নেতৃত্বে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। ছাত্র সংসদের ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, এ ধরনের হামলা নতুন নয় এবং বারবার শিক্ষার্থীরা একই ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধারাবাহিকতা বন্ধ করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, ঘটনা জানার পরপরই প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থলে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি—ইমন ও নাঈমকে গ্রেফতার করে। হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, রাত আড়াইটার দিকে নাঈমকে এবং ভোর চারটার দিকে ইমনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা আশ্বাস তৈরি করলেও, তারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছেন।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিবৃতি দেন। তিনি জানান, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এর আগেও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে একই ধরনের একটি ঘটনায় তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। ফলে এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক সমস্যার অংশ বলেই মনে করছেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বজায় রাখতে হলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কিন্তু বারবার এমন সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। বিশেষ করে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনা শুধু একটি হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দ্রুত গ্রেফতার হলেও শিক্ষার্থীরা চাইছেন স্থায়ী সমাধান, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত