দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের (Measles) উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এই মৃত্যুর ঘটনায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে রোগটি আবারও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার শিশুর মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ রোগটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা সহজলভ্য হলেও অনেক এলাকায় এখনো পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম।
একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের মতে, “হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ ধরনের মৃত্যু প্রায় শতভাগ এড়ানো সম্ভব। কিন্তু টিকাদানে ফাঁক থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, সামাজিক অনীহা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পৌঁছানোর সমস্যার কারণে টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলেই মাঝে মাঝে ছোট ছোট প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন বা টিকা গ্রহণের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর নির্দেশনা অনুযায়ী, হামের বিস্তার রোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুদের দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক দেশেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে হামের ছোট প্রাদুর্ভাব বড় আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে শীত ও বসন্ত মৌসুমে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
চিকিৎসকরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের টিকাদান সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে এবং কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধমূলক টিকা। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে জটিলতা দ্রুত বাড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, বরং জনসচেতনতা, টিকাদান কার্যক্রম এবং মাঠ পর্যায়ের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা বা শিথিলতা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।