প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লক্ষ্মীপুরে খাল খনন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক বক্তব্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, খাল খনন কার্যক্রম যদি ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রাখা যায়, তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক “বিপ্লব” সৃষ্টি হতে পারে। তার এই মন্তব্য ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্থানীয় জনগণ, প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে খাল পুনঃখননের প্রয়োজনীয়তা ও এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন তিনি।
এ্যানি তার বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খননের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল বা খুবই সীমিত আকারে পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে অনেক খাল দখল হয়ে গেছে, কোথাও অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও শিল্পকারখানার বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “খালের দুই পাড়ে এবং খালের ভেতরে পর্যন্ত অনেকে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে। কোথাও বাড়িঘর হয়েছে, কোথাও দোকানপাট হয়েছে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য এসে অনেক খাল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি খাল পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে শুধু জলাবদ্ধতা কমবে না, বরং কৃষি উৎপাদনও বাড়বে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতির একটি বড় অংশ পানির ওপর নির্ভরশীল, তাই পানি সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
পানিসম্পদ খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “মানুষ অত্যন্ত সচেতন। তারা নিজেরা কষ্ট করে কৃষিকাজ করে। নারকেল, সুপারি, শাকসবজি ও মাছ উৎপাদনের জন্য পানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই পানিটাকে ধরে রাখতে হবে। খাল খননের মাধ্যমে আমরা সেই পানি সংরক্ষণ করতে পারব এবং শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করতে পারব।”
এ্যানি আরও বলেন, খাল খনন কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ জলাবদ্ধতা, কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়া—সবকিছুর সঙ্গেই খাল ব্যবস্থাপনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি জানান, রহমতখালী, ওয়াপদাখাল এবং ভুলুয়া নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এসবের সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট খালগুলোও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তার ভাষায়, “দুই-চারটি খাল খনন করলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে না। জলাবদ্ধতা দূর করা, নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এই কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।”
তবে বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তার রাজনৈতিক মন্তব্য। তিনি বলেন, যদি এই ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে নতুন এক ধরনের পরিবর্তন বা “বিপ্লব” দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভিশনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, Tarique Rahman বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বকে ঘিরে দলটি দীর্ঘদিন ধরে পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক পুনরুত্থানের কৌশল নিয়ে কাজ করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী, মন্ত্রীর একান্ত সচিব জামশেদ আলম রানা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা এবং বাফুফে সহসভাপতি ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী হ্যাপি প্রমুখ।
স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, খাল পুনঃখনন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় কৃষকদের একাংশও খাল খনন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খাল ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের অভাবে অনেক কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় জীবিকায়ও প্রভাব পড়েছে। খাল পুনরুদ্ধার হলে কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সঙ্গে রাজনৈতিক বার্তা যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে “বিপ্লব” শব্দের ব্যবহার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুরের এই খাল খনন কর্মসূচি শুধু একটি স্থানীয় উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি রাজনৈতিক বক্তব্য, উন্নয়ন ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি মিশ্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।