দাম বাড়লেও পাম্পে কমেনি তেলের লাইন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কঘেঁষা ফিলিং স্টেশনগুলোতে আবারও ভিড়ের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পরও পাম্পের সামনে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি কমেনি, বরং অনেক জায়গায় তা আরও দীর্ঘ হয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববার ভোর থেকেই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের উপস্থিতিতে পাম্পগুলোতে তৈরি হয় চাপের পরিবেশ।

ভোরের আলো ফোটার আগেই অনেক চালক লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন, কেউ কেউ রাত থেকেই অপেক্ষা করেছেন বলে জানান। তাদের চোখে ক্লান্তি থাকলেও বিকল্প কোনো পথ না থাকায় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন। জ্বালানি ছাড়া দৈনন্দিন জীবন যেন থমকে যায়, তাই বাড়তি খরচ মেনেও তেল সংগ্রহে পিছপা হচ্ছেন না কেউ।

সরকার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে। শনিবার রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর হওয়া এই দামে ডিজেল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।

দাম বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তেলের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। অনেকেই আগাম তেল মজুদ করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বাস্তবে পাম্পগুলোতে রেশনিং পদ্ধতি চালু থাকায় নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল পাচ্ছেন না ক্রেতারা। এতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল না পাওয়ার হতাশা বাড়ছে।

আসাদ গেট, তেজগাঁও এবং পরীবাগ এলাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক চালক জানান, রাত থেকে অপেক্ষা করেও তারা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না।

একজন মোটরসাইকেল চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর আগে যদি কিছুটা ভাবা হতো, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কম পড়ত। তিনি আরও বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বাস্তবতা হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলে পরিবহন খরচে, আর সেই প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাজারে। ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত দেড় মাস ধরে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এতদিন জেট ফুয়েল ছাড়া অন্য জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সব ধরনের তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই সিদ্ধান্ত বাজারে স্বস্তি আনার বদলে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে বলে অনেকের মত।

তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ করায় দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল হবে।

তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত মজুদ করার প্রবণতা কমবে। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা ন্যায্যভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। যদিও বাস্তব পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকরা এখনও সেই স্বস্তির কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন না।

পাম্পগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় কর্মীরা নির্ধারিত সীমার বাইরে তেল দিতে অনাগ্রহী। তারা বলছেন, সরবরাহ সীমিত থাকায় এই ব্যবস্থা চালু রাখা ছাড়া উপায় নেই। এতে একদিকে যেমন লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ১ ফেব্রুয়ারি সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি দুই টাকা কমিয়েছিল। সেই কম দাম মার্চ এবং এপ্রিল মাসেও বহাল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আবারও দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে বাজারে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর পাম্পগুলোর বর্তমান চিত্র এক ধরনের অস্বস্তিকর বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দাম বাড়লেও চাহিদা কমেনি, বরং অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ আরও বেশি করে তেল সংগ্রহে ঝুঁকছে। ফলে দীর্ঘ লাইন যেন এখন নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে শহরের জ্বালানি পাম্পগুলোতে।

পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের ওপর। তবে আপাতত ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পাম্পের সামনে অপেক্ষা করা মানুষদের ধৈর্যই যেন এই সংকটের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত