প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে একজন শিশু নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দুজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ দেখা গেলেও তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
Directorate General of Health Services-এর হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে মঙ্গলবার সকালে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই পরিসংখ্যান নতুন করে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একই সময়ে সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৫৯ জন। এতে করে চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৩৫ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ঝুঁকি বেশি থাকে।
চলতি বছর শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে। পাশাপাশি সন্দেহজনকভাবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮৫ জন। এই সংখ্যাগুলো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি অথবা যাদের টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ মার্চের পর থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮০৫ জন। এর মধ্যে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ৮৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৪ হাজার ১০৬ জন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই রোগ থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে গুজব বা ভুল তথ্যের প্রভাব থাকতে পারে। অনেক অভিভাবক এখনো শিশুদের সময়মতো টিকা দিতে আগ্রহী নন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না, যার ফলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে পারলে এই রোগের সংক্রমণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিশুদের মধ্যে যদি জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জও। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে। তারা আশাবাদী, সঠিক সময়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, দেশে হাম সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।