সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের আয়-সুবিধা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের আয়-সুবিধা

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন দীর্ঘদিন ধরেই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই আসনগুলোর বণ্টন নিয়ে যেমন রাজনৈতিক আলোচনা চলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা কি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতোই বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পান?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে আইনগত কাঠামোর বিষয়টি। বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারিত হয় ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’-এর মাধ্যমে, যা বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে এর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। এই আইনের আওতায় সংসদের সকল সদস্য, অর্থাৎ সরাসরি নির্বাচিত কিংবা সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য—দু’ধরনের এমপিই একই কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পার্থক্য রাখা হয়নি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরাও অন্যান্য এমপিদের মতোই রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত বেতন পান। বর্তমানে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা। এই বেতনের পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের ভাতা, যা তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাতা হলো নির্বাচনী এলাকা ভাতা। সংরক্ষিত নারী এমপিরাও প্রতি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে এই ভাতা পান, যদিও তাদের নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা থাকে না। তবে দলীয় দায়িত্ব ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ভাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে মাসিক ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা প্রদান করা হয়, যা বিভিন্ন সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়।

পরিবহন খাতে সংসদ সদস্যদের জন্য রয়েছে উল্লেখযোগ্য সুবিধা। একজন নারী এমপি প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান, যার মধ্যে গাড়ির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর পাশাপাশি নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা অফিস ব্যয় ভাতা দেওয়া হয়, যা একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক।

দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন খরচের জন্যও সংসদ সদস্যদের আলাদা ভাতা নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে লন্ড্রি ভাতা হিসেবে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিবিধ ব্যয় বাবদ ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই অর্থ বাসনপত্র, বিছানাপত্র, টয়লেট্রিজসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়।

সংসদ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত সুবিধাগুলোর একটি হলো শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ। আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য তার দায়িত্বকালীন সময়ে নির্দিষ্ট শর্তে একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন কোনো শুল্ক বা ভ্যাট ছাড়াই। পাঁচ বছর পর আবার একই সুযোগ পাওয়া যায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় এমপিরা এই সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, তবুও এটি আইনি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।

ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সংসদের অধিবেশন, কমিটির সভা বা দায়িত্বসংক্রান্ত কাজে যাতায়াতের জন্য তারা অতিরিক্ত ভাতা পান। রেল, বিমান কিংবা নৌপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হয়। সড়কপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও কিলোমিটার অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ভাতা প্রদান করা হয়। এছাড়া বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্রমণ ভাতা অথবা সমপরিমাণ ট্রাভেল পাস সুবিধা দেওয়া হয়।

সংসদ অধিবেশন বা কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণের সময় সংসদ সদস্যরা দৈনিক ভাতাও পেয়ে থাকেন। দায়িত্বস্থলে অবস্থান করলে তারা প্রতিদিন ৭৫০ টাকা দৈনিক ভাতা এবং ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতা পান। আবার অধিবেশনে উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিদিন ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতা ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হয়।

চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা বিশেষ সুযোগ ভোগ করেন। তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পান। পাশাপাশি মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহে সহায়ক।

নিরাপত্তা বিবেচনায় সংসদ সদস্যদের জন্য ১০ লাখ টাকার বিমা সুবিধাও রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব ঘটলে এই বিমা কার্যকর হয়, যা তাদের পরিবারের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

এছাড়া সংসদ সদস্যদের জন্য একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন। এই তহবিল নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেয়, যা তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে।

টেলিযোগাযোগ সুবিধার অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয়। এই খাতে মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় বহন করা হয়, যা যোগাযোগ সহজতর করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের এই ভাতা ও সুবিধাগুলো আয়করমুক্ত। অর্থাৎ তারা এসব সুবিধার ওপর কোনো কর প্রদান করতে বাধ্য নন। এছাড়া অতীতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্লট বরাদ্দ পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে, যা সংসদ সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। আইনগতভাবে তারা সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের সমান মর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করেন। এই সমতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই নারী প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তাদের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত