প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে নতুন করে এক হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে রোগটির উপসর্গ শনাক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। চলমান এই পরিস্থিতি শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২২ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২৯ জনে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৬৪ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৪ জন।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১৭ হাজার ৯৯৮ জন রোগী। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯২ জন। এতে বোঝা যায়, বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও একটি বড় অংশ এখনো চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও, সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৮ জন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ সাধারণত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। ভাইরাসজনিত এই রোগটি সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং শুরুতে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখে লালচে ভাবের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরবর্তীতে শরীরে র্যাশ বা দাগ দেখা দিলে রোগটি আরও জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হামের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর জটিলতা, যা নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা অপুষ্টিজনিত সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক সময় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে একই পরিবারের একাধিক শিশু আক্রান্ত হয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। শুরুতে কয়েকশ রোগী শনাক্ত হলেও ধীরে ধীরে তা হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের মতে, হামের প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা। তবে অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত টিকা কাভারেজ নিশ্চিত করা যায়নি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকট এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিস্তার রোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, পরিবার পর্যায়ে সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। শিশুর মধ্যে জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা প্রয়োজন, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।