৪৩ লাখ টাকায় প্রতারণা, লিবিয়ায় বন্দি যুবক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
৪৩ লাখ টাকায় প্রতারণা, লিবিয়ায় বন্দি যুবক

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বপ্ন ছিল ইউরোপের মাটিতে পা রেখে নিজের ভাগ্য বদলানোর। পরিবারও সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মাদারীপুরের এক যুবক ৪৩ লাখ টাকা দিয়েও ইতালি যেতে পারেননি; বরং প্রতারণার শিকার হয়ে বর্তমানে লিবিয়ায় বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। গত ১৮ দিন ধরে তার কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর অসহায়ত্বে দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।

বুধবার দুপুরে মাদারীপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ আলভী খানের পরিবারের সদস্যরা তাদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলভী খান (২৫) সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের কুন্তিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এমদাদ হোসেন খানের ছেলে। পরিবারের অভিযোগ, দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে তিনি এখন বিদেশে মানবপাচারের শিকার হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

স্বজনদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় দালালচক্রের সক্রিয় সদস্য রাতুল হাওলাদার আলভীকে ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দেন। তিনি দাবি করেছিলেন, বৈধভাবে আকাশপথে সরাসরি ইতালি নেওয়া হবে। প্রথমে ২১ লাখ টাকায় চুক্তি হলেও পরে বিভিন্ন অজুহাতে পুরো টাকা পরিশোধ করতে হয়। ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ অর্থ দেওয়া হয়। পরিবারের ধারণা ছিল, সবকিছু বৈধ প্রক্রিয়াতেই হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই আলভী ইতালিতে পৌঁছাবেন।

চুক্তির মাত্র চারদিন পর, ১৯ অক্টোবর আলভীকে আকাশপথে সৌদি আরব নেওয়া হয়। এখান থেকেই শুরু হয় প্রতারণার মূল অধ্যায়। সৌদি আরব থেকে তাকে আর ইতালিতে না পাঠিয়ে দালালচক্রের সদস্যরা গোপনে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর আলভী বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে শুরু হয় নির্যাতন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, লিবিয়ায় আটকে রেখে আলভীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রমাণ হিসেবে দালালচক্র অডিও বার্তা পাঠিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। ছেলের জীবন বাঁচাতে অসহায় পরিবারটি বাধ্য হয়ে গত ৪ নভেম্বর বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ২২ লাখ টাকা পাঠায়। সব মিলিয়ে ৪৩ লাখ টাকা খরচ করেও তারা সন্তানের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি।

এতেই শেষ হয়নি দুর্ভোগ। মুক্তিপণ দেওয়ার পরও দালালচক্র আবার নতুন করে টাকা দাবি করে। কিন্তু আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত পরিবারটি তখন আর অর্থ জোগাড় করতে পারেনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দালালচক্র গত ৪ এপ্রিল থেকে আলভীর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে আলভীর বাবা এমদাদ হোসেন খান ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, তারা সবকিছু হারিয়ে এখন শুধু ছেলের প্রাণভিক্ষা চাইছেন। তিনি জানান, একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে তারা জমিজমা বিক্রি করেছেন, ঋণ নিয়েছেন, আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পেতেছেন। কিন্তু এখনো ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তারা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।

পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না দেখে অবশেষে আইনের আশ্রয় নেয় পরিবারটি। গত ১৯ এপ্রিল আলভীর বাবা বাদী হয়ে রাতুল হাওলাদারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা করে আলভীকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তার পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে।

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, মামলার প্রধান আসামি রাতুল হাওলাদারকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” তিনি আরও জানান, আন্তঃদেশীয় অপরাধ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ঘটনা নতুন কিছু নয়; বরং বাংলাদেশে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার একটি বড় চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। বিশেষ করে ইউরোপে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে অনেক তরুণকে অবৈধ পথে পাঠানো হয়, যেখানে তারা পাচারকারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এমন মানবপাচারের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত, যেখানে আটক হয়ে বহু মানুষ অমানবিক পরিস্থিতিতে দিন কাটান।

এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। স্বপ্নপূরণের আশায় পরিবারগুলো যখন সর্বস্ব দিয়ে দেয়, তখন সেই স্বপ্নই কখনো কখনো জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আলভী খানের পরিবারের জন্য এখন প্রতিটি দিনই এক অনিশ্চিত অপেক্ষা। তারা জানেন না তাদের সন্তান বেঁচে আছেন কিনা, কেমন আছেন, কিংবা আদৌ ফিরে আসতে পারবেন কিনা। তাদের একটাই দাবি—দ্রুত আলভীর সন্ধান নিশ্চিত করা এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে—বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যত বড়ই হোক, তা বাস্তবায়নের পথ যদি নিরাপদ ও বৈধ না হয়, তবে সেই স্বপ্নই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আলভীর মতো আরও অনেক তরুণ যেন এমন পরিণতির শিকার না হন, সে জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত