এমপিদের বেতন-ভাতা: বাস্তবতা না বিলাসিতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার
এমপিদের বেতন-ভাতা: বাস্তবতা না বিলাসিতা

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের (এমপি) বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে জাতীয় সংসদ। সম্প্রতি সংসদে গাড়ির সুবিধা চাওয়ার একটি দাবি ঘিরে বিষয়টি নতুন করে জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে কী ধরনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দেওয়া হয় এবং তা কতটা যৌক্তিক বা সময়োপযোগী।

প্রচলিত আইন ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী, একজন এমপি মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান। তবে এই বেতনের বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সুবিধা, যা মিলিয়ে তাদের মোট আর্থিক প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো মাসিক ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা, যা দিয়ে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন বহন করার কথা বলা হয়।

এছাড়া এমপিরা প্রতি মাসে নির্বাচনী এলাকা ভাতা হিসেবে পান ১২ হাজার ৫০০ টাকা, আপ্যায়ন ভাতা ৫ হাজার টাকা, টেলিফোন ভাতা ৭ হাজার ৮০০ টাকা, ধোলাই বা লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৭০০ টাকা। এসব ভাতা আয়করমুক্ত হওয়ায় তাদের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা আরও বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকাও দেওয়া হয়।

এই আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি এমপিদের জন্য রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা। রাজধানীর ন্যাম ভবনে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ, সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ, চিকিৎসা সুবিধা এবং ভ্রমণ সুবিধা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির সভায় অংশগ্রহণের জন্য দৈনিক ভাতা এবং যাতায়াত ভাতাও নির্ধারিত রয়েছে। সরকারি কাজে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেল, বিমান বা নৌপথে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনীয় একটি সুবিধা হিসেবে বিবেচিত।

তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে যখন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ উপজেলা পর্যায়ে অফিসে যাতায়াত সহজ করতে গাড়ির সুবিধা চাওয়ার দাবি তোলেন। তার এই বক্তব্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই এটিকে বাস্তব প্রয়োজন হিসেবে দেখলেও, কেউ কেউ বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটিকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

এই দাবির প্রেক্ষিতে সংসদে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই সংসদ সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত বিলাসিতা বা নতুন সুবিধা না নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি বিদ্যমান আইন সংশোধন করে এমপিদের জন্য করমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিলের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ঋণ সুবিধাও সীমিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে কোনো সুবিধা যোগ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানান। তিনি সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, তরুণ সংসদ সদস্যের একটি দাবিকে সরাসরি নাকচ না করে তা বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলে সেটি আরও ইতিবাচক বার্তা দিত। তার বক্তব্যে খানিকটা রসিকতার সুর থাকলেও, এতে সংসদীয় আলোচনার মানবিক দিকটি ফুটে ওঠে।

এই বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা কি একই ধরনের সুবিধা পান? নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী এমপিদের ক্ষেত্রেও কোনো পার্থক্য নেই। তারা সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের মতোই একই বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে নারী প্রতিনিধিদের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের অন্যতম বড় সুবিধা হলো শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ। একজন এমপি তার মেয়াদকালে একটি গাড়ি কর ছাড়াই আমদানি করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার একই সুবিধা নিতে পারেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারদল ও বিরোধীদল উভয় পক্ষ থেকেই এই সুবিধা গ্রহণ না করার একটি নৈতিক অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে, যা জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

এছাড়া সংসদ সদস্যদের জন্য রয়েছে বিমা সুবিধা, যা দায়িত্ব পালনের সময় দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। একইসঙ্গে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে, যা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এমপিদের এই সুবিধাগুলো একদিকে যেমন তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়ক, অন্যদিকে তা রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াও জরুরি। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তখন এই ধরনের সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠতেই পারে।

সব মিলিয়ে, সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এই নতুন বিতর্ক শুধু একটি দাবি বা পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি, জনসেবার মান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কোনো নীতিগত পরিবর্তনের পথে এগোয় কি না, এবং তা জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত