দামুড়হুদায় ডিজেল সংকটে সেচ বন্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
দামুড়হুদায় ডিজেল সংকটে সেচ বন্ধ

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় তীব্র ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে। স্যালো ইঞ্জিন ও পাওয়ার ট্রিলার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় মাঠে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সময়মতো সেচ না দিতে পারলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডিজেল সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাম্প ও খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে বারবার ঘুরেও অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন। কেউ কেউ গভীর রাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না। দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতিতে কৃষিকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

দামুড়হুদা উপজেলার বদলপুর গ্রামের কৃষক আবু সামা জানান, তার নিজস্ব একটি স্যালো ইঞ্জিন ও ভুট্টা ভাঙার মেশিন রয়েছে, যা দিয়ে তিনি নিজের জমিসহ অন্যদের জমিতে সেচ ও কৃষি কাজ করে থাকেন। তার ৬ থেকে ৭ বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে। প্রতিদিন তার কমপক্ষে ৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ডিজেল না পাওয়ায় নিজের জমিতেও সেচ দিতে পারছেন না, পাশাপাশি অন্য কৃষকদের কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ পর তার জমির ধান কাটার সময় আসবে, কিন্তু এখনই পর্যাপ্ত পানি না পেলে ফলন অনেক কমে যাবে। কয়েক দিন আগে মাত্র ১০ লিটার ডিজেল পেয়েছিলেন, যা এক বেলার সেচেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর থেকে আর কোনো জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেননি। এতে তার পাওয়ার ট্রিলার ও ভুট্টা ভাঙার মেশিনও পড়ে আছে অচল অবস্থায়।

একই এলাকার পুরাতন বাস্তপুর গ্রামের কৃষক আবু তালেব, আব্দুল মান্নান, আব্দুল আলিম ও হাকিম জানান, তারা কয়েক দিন আগে কোনোভাবে অল্প পরিমাণে ডিজেল পেলেও তা দিয়ে মাত্র একবার সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) গভীর রাতে তারা টোকেন বা কার্ড নিয়ে লাইনে দাঁড়ালেও বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষার পর জানানো হয়, তেল শেষ হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের।

কৃষকদের অভিযোগ, লাইনে শৃঙ্খলা না থাকায় অনেকেই নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত পরিমাণে তেল সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না। এতে করে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। তারা জানান, ধানক্ষেতে অন্তত ৩ থেকে ৪ বার সেচ দেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একবার সেচ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো সেচ না দিতে পারলে চলতি মৌসুমে ধানের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে শুধু কৃষকদের ক্ষতি নয়, স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছেন। অনেকের মতে, উৎপাদন ব্যাহত হলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন উপজেলা কৃষি দপ্তরের অতিরিক্ত কর্মকর্তা অভিজিৎ কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, যেসব ধান ইতোমধ্যে পরিপক্ব হয়ে গেছে, সেখানে সেচ না দিলে বড় ধরনের ক্ষতি নাও হতে পারে, তবে ধান পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, যেসব জমির ধান এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি, সেখানে অন্তত দুই থেকে তিনবার সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি উৎপাদনে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু কৃষক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ধান উৎপাদন কমে গেলে চালের বাজারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকরা দ্রুত এই সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ব্যাংক ঋণ ও ধার-দেনা করে কৃষিকাজ শুরু করেছেন, ফলে উৎপাদন কমে গেলে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসন ও জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থার আরও কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকদের জন্য আলাদা ও নিশ্চিত সরবরাহ ব্যবস্থা চালু না করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দামুড়হুদার বর্তমান পরিস্থিতি কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সময়মতো সমাধান না হলে শুধু কৃষকরাই নয়, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত