প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল খাতকে আবারও সচল করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বন্ধ থাকা ছয়টি পাটকল আগামী ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পাট খাতে নতুন করে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বন্ধ জুট মিল, কারখানা চালু ও ইজারা সংক্রান্ত বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি এ ঘোষণা দেন।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোকে সম্পূর্ণভাবে সচল করার পরিবর্তে বেসরকারি খাতে ইজারা বা বিনিয়োগের মাধ্যমে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো এই খাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করা, যাতে উৎপাদন বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে বন্ধ থাকা অন্যান্য পাটকলও একই প্রক্রিয়ায় চালু বা ইজারা দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পাট শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মিলগুলো চালু হলে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না, বরং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা পাটকল চালুর প্রক্রিয়া, বিনিয়োগ কাঠামো এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় মন্ত্রী নির্দেশনা দেন, প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ ও দ্রুত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, পাট খাত একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল, তাই এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। পাটজাত পণ্য সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাটকলগুলো পুনরায় চালু করা গেলে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
তারা আরও বলেন, আগে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অনেক পাটকল লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন বেসরকারি খাতে পরিচালিত হলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও তারা শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা দাবি করেছেন। তাদের মতে, পুনরায় চালু হওয়া পাটকলগুলোতে যেন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাট খাত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার কারণে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। নতুন এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ছয়টি পাটকল বেসরকারি উদ্যোগে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারী নির্বাচন, অবকাঠামো সংস্কার এবং উৎপাদন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু পাট শিল্পই নয়, সামগ্রিক শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের পাট শিল্প পুনরুজ্জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর।