আলোর প্রযুক্তিতে রোগ শনাক্তে নতুন সম্ভাবনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
আলোর ব্যবহারে রোগ শনাক্তের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে বাংলাদেশি ৩ গবেষক

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আলো ব্যবহার করে ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ খুব প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করার নতুন এক গবেষণা দিগন্তের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশি তরুণ গবেষকদের একটি দল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেক্সাসের লামার ইউনিভার্সিটিসহ আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে এই কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন তিনজন বাংলাদেশি গবেষক—এস. এম. রাকিবুল ইসলাম, মোহাম্মদ রুবায়েত ইসলাম এবং মোহাম্মদ সবুজ মিয়া।

গবেষণার মূল লক্ষ্য এমন একটি উন্নত বায়োসেন্সর প্রযুক্তি তৈরি করা, যা খুব সামান্য জৈবিক পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবদেহের রক্ত বা কোষে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে পারলে অনেক রোগের ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে ফোটোনিক ক্রিস্টাল ফাইবার ভিত্তিক অপটিক্যাল বায়োসেন্সর প্রযুক্তি। এই বিশেষ ফাইবারের ভেতরে ক্ষুদ্র বায়ু ছিদ্রযুক্ত গঠন থাকে, যা আলোর সঙ্গে জৈব উপাদানের গভীর মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে। এর ফলে রক্ত বা কোষের খুব ছোট পরিবর্তনও আলোর আচরণে পরিবর্তন ঘটায়, যা বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করা যায়।

গবেষকরা আরও উন্নত ফলাফলের জন্য সারফেস প্লাজমন রেজোন্যান্স বা এসপিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এতে সোনার মতো ধাতুর পাতলা স্তর সেন্সরের ওপর যুক্ত করা হয়, যা আলোর প্রতিফলন ও তরঙ্গ বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনে। এই পরিবর্তন বিশ্লেষণের মাধ্যমে শরীরের ভেতরের জৈবিক অবস্থার সূক্ষ্ম তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজ, হিমোগ্লোবিন, অ্যালবুমিন ও ইউরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়। এসব উপাদানের তারতম্য ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রাথমিক ইঙ্গিত বহন করে। ফলে রোগ অনেক আগেই শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত, কম খরচে এবং সহজে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার নতুন পথ খুলে যাবে, যা সাধারণ মানুষের জন্যও সহজলভ্য হতে পারে।

ক্যান্সার শনাক্তকরণেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সার কোষের আলোক প্রতিফলন বৈশিষ্ট্যে সাধারণ কোষের তুলনায় সামান্য পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্য শনাক্ত করা গেলে রোগটি অনেক আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।

গবেষক এস. এম. রাকিবুল ইসলাম জানান, আলোভিত্তিক এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় খুব ছোট পরিবর্তনও ধরা পড়ে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এমন সেন্সর তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে, যা ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ খুব প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে পারবে।

মোহাম্মদ রুবায়েত ইসলাম বলেন, ফাইবারের নকশা ও অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য উন্নত করে সেন্সরের কার্যক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব। সঠিক নকশা হলে এটি বায়োমেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে মোহাম্মদ সবুজ মিয়া জানান, তাদের লক্ষ্য এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা যা দ্রুত, সহজ এবং নির্ভরযোগ্য। এতে ভবিষ্যতে হাসপাতালের বাইরে থেকেও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে, যা বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের অপটিক্যাল বায়োসেন্সর প্রযুক্তি সফল হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটতে পারে। রোগ শনাক্তকরণের সময় কমে যাবে এবং চিকিৎসা শুরু করা যাবে আরও আগেই, ফলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।

গবেষক দল আশা করছে, তাদের কাজ সফলভাবে এগোলে ছোট ও বহনযোগ্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে ঘরে বসেই প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে বাংলাদেশি তরুণদের এই অংশগ্রহণকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে দেশের বিজ্ঞান ও চিকিৎসা খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত