প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন এক অর্থনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করল ইরান। বহুল আলোচিত এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপ করে প্রথমবারের মতো রাজস্ব আয় করেছে দেশটি। ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজিবাবাই এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হাজিবাবাই বলেন, হরমুজ প্রণালিতে টোল থেকে প্রাপ্ত প্রথম রাজস্ব ইতোমধ্যেই ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে জমা হয়েছে। তবে কত পরিমাণ অর্থ আদায় হয়েছে বা কোন প্রক্রিয়ায় তা সংগ্রহ করা হয়েছে—এই বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তথাপি এই ঘোষণা থেকেই স্পষ্ট, ইরান তার কৌশলগত অবস্থানকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পথে দৃঢ়ভাবে এগোচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এই প্রণালিতে যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা সীমাবদ্ধতা বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরেই এই পথকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেই প্রেক্ষাপটে টোল আরোপের সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তাও বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক পর্যায়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নানা কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে আবারও প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে করে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাদের নৌ অবরোধ বজায় রাখবে। তার এই অবস্থান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও তিনি দ্রুত সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তায় ভরপুর।
ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা জাহাজ মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ইরানের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য। অন্যথায় নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে টোল আরোপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ইরানের জন্য একদিকে রাজস্ব আয়ের নতুন উৎস তৈরি করছে, অন্যদিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যেই এই উত্তেজনার কারণে ওঠানামা করছে। হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বা অতিরিক্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশই এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও এ নিয়ে তৎপরতা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
ইরানের এই পদক্ষেপকে কেউ কেউ সাহসী অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে উত্তেজনা বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই টানাপোড়েন যতদিন চলবে, ততদিন বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এর প্রভাব অব্যাহত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের টোল আদায়ের মাধ্যমে প্রথম রাজস্ব প্রাপ্তি শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি দেখিয়ে দেয়, কৌশলগত অবস্থানকে কীভাবে একটি দেশ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, আবার সেই সঙ্গে কীভাবে তা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।