প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে আবারও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে হাম। একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই ভাইরাসজনিত রোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য খাতে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে নিশ্চিত হামে একজন এবং হাম-সন্দেহে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত দেড় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে একটি বড় সতর্ক সংকেত।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৫৯ জন। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জন এবং নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১২৫ জন, যা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে স্পষ্ট করে।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি উদ্বেগ এবং অনেক ক্ষেত্রে শোকের গল্প। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেশি। হাসপাতালগুলোতেও চাপ বাড়ছে, কারণ আক্রান্তদের একটি বড় অংশ চিকিৎসার জন্য ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে সন্দেহভাজন হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৮৪৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়তে পেরেছেন ১৫ হাজার ৭২৮ জন। যদিও সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জক, তবুও নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
মৃত্যুর সংখ্যাও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চিত হামে গত দেড় মাসে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একজন রয়েছেন। অন্যদিকে একই সময়ে হাম-সন্দেহে মারা গেছেন ১৯৪ জন, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং কাশির মতো উপসর্গ দিয়ে রোগটি শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বাড়লে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। অনেক অভিভাবক এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকা দিতে অবহেলা করেন, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকাই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই এখন এই রোগের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন, যা সংক্রমণের দ্রুত বিস্তারের প্রমাণ দেয়। চিকিৎসকরা তাই উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। দেরি করলে রোগের জটিলতা বাড়তে পারে এবং তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, এটি কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির সমস্যা নয়; বরং একটি গুরুতর সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও অতীতে সফলভাবে হাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক এই উত্থান নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হামের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে। এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, যাতে এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।