রানা প্লাজা মামলা ১৩ বছরেও ঝুলে, নেই রায়ের আভাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৫ বার
রানা প্লাজা মামলা ১৩ বছরেও ঝুলে, নেই রায়ের আভাস

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি রানা প্লাজা ধস। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া এখনও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এই মামলাটি এখনো বিচারিক আদালতের গণ্ডি পেরোতে পারেনি, যা ভুক্তভোগী পরিবার, শ্রমিক সমাজ এবং আইন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে সাভার-এ অবস্থিত বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই ঘটনায় প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক, আহত হন কয়েক হাজার। অনেকেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল না, বরং দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এই ঘটনা।

ঘটনার পর দায়ীদের বিচারের দাবিতে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে রানা প্লাজা ধসকে কেন্দ্র করে মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর মধ্যে মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ছিল ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ সংক্রান্ত তুলনামূলক ছোট একটি মামলা। অবহেলায় হত্যাসহ বাকি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা এখনও বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং সেগুলোর অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির।

বর্তমানে হত্যা মামলাটিই সবচেয়ে আলোচিত, যেখানে মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর তালিকা রয়েছে। কিন্তু এতদিনে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ১৪৫ জনের। এই পরিসংখ্যান থেকেই বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। আদালত আগামী ৩০ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছে, তবে বর্তমান গতিতে বিচার শেষ হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মামলার আসামি সংখ্যা ৪১ জন। এদের মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও বাকিদের কেউ পলাতক, আবার কেউ জামিনে মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারের বিলম্ব অনেক ক্ষেত্রে আসামিদের আইনি সুবিধা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এত বড় একটি মানবিক বিপর্যয়ের বিচার প্রক্রিয়া যে গতিতে এগোচ্ছে, তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। তাদের মতে, আগের সরকারের সময় এই মামলার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাব এবং নানা জটিলতায় বিচার কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার মতো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি, যা এই দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া জরুরি। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ খান খোকনের মতে, বাকি সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা গেলে মামলার পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করা সহজ হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আদালতের সময়সূচি, আইনজীবীদের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলিয়ে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে করে ভুক্তভোগীদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

রানা প্লাজা ধস শুধু একটি বিচারিক বিষয় নয়, এটি একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। এই ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের জন্য প্রতিটি দিনই একটি না-পাওয়া ন্যায়ের প্রতীক্ষা। অনেক পরিবার এখনও ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিয়ে সংগ্রাম করছেন। অন্যদিকে আহত শ্রমিকদের অনেকেই আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

এই ঘটনার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। তবে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি সেই ইতিবাচক অগ্রগতিকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বড় একটি মামলার বিচার দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন বা কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছেন।

বর্তমান গতিতে বিচার কার্যক্রম এগোতে থাকলে চলতি বছরের মধ্যে রায় ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বিচার আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সব মিলিয়ে, ১৩ বছর পরও বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া শুধু একটি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নয়, বরং এটি দেশের বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত