প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ভোজ্যতেল, বিশেষ করে সয়াবিন তেল, আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে বড় কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ভোক্তাকে চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সয়াবিন তেলের বাজারের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলোই মূলত আমদানি, রিফাইনিং এবং বাজারজাতকরণের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাজার ছোট কোম্পানির হাতে থাকলেও তারা মূল দামের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেছেন, এই বড় কোম্পানিগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পিতভাবে ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং ভোক্তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হন। তার মতে, এটি শুধু ব্যবসায়িক কৌশল নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
খুচরা বাজারে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক দোকানে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে এক লিটার ও দুই লিটারের বোতলের সংকট সবচেয়ে বেশি। একই সময়ে খোলা সয়াবিন তেলের দামও হঠাৎ বেড়ে লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২১০ টাকায় পৌঁছেছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও মিল পর্যায়ে সরবরাহ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ডিলাররা চাহিদার তুলনায় খুব কম পরিমাণ তেল পাচ্ছেন। কোথাও ২০ কার্টনের চাহিদার বিপরীতে ২ থেকে ৪ কার্টন সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে মূল্য না বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো কিছু কোম্পানি নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতল ১০২০ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
এদিকে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিছু ডিলার দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে, ফলে তারা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে ভোক্তা সংগঠনগুলো বলছে, এটি মূলত অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন ভোজ্যতেল মজুত রয়েছে এবং আরও বিপুল পরিমাণ তেল পাইপলাইনে রয়েছে। এই পরিমাণ মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে সংকট তৈরি হওয়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি সীমিত সংখ্যক কোম্পানির হাতে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে থাকলে প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয় এবং সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এ অবস্থায় সরকারকে আরও কঠোর নজরদারি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি।
সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রান্নার তেলের মতো অপরিহার্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আমদানি, মজুত এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো না গেলে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, সয়াবিন তেলের বাজারে চলমান সংকট কেবল একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং এটি পুরো বাজার ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।