প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিনের দমবন্ধ করা দূষণের পর অবশেষে রাজধানীর আকাশে মিলছে কিছুটা স্বস্তির আভাস। ব্যস্ত নগরজীবনে যেখানে ধোঁয়া, ধুলা আর বিষাক্ত বায়ু প্রায় প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল, সেখানে হঠাৎ করেই বাতাসের মান উন্নতির খবর যেন অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস এনে দিয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। গত কয়েক মাস ধরে ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকলেও সাম্প্রতিক দিনে তার কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল ১৫তম। এ সময় শহরের বায়ুমানের সূচক বা একিউআই স্কোর ছিল ৯৬, যা ‘মাঝারি’ বা সহনীয় পর্যায়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার বায়ু সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হলেও সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য এখনও কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন।
কয়েকদিন আগেও ঢাকার অবস্থান তালিকার প্রথম সারিতে ছিল, যেখানে বায়ুমান প্রায়শই ‘অস্বাস্থ্যকর’ কিংবা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছে যেত। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত। আবহাওয়ার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা এবং বাতাসের গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে এই উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী Delhi, যেখানে একিউআই স্কোর ২৩১—যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। একই দেশের আরেক মেগাসিটি Mumbai-এর স্কোর ৯২, যা ঢাকার কাছাকাছি এবং তুলনামূলকভাবে সহনীয়। অন্যদিকে প্রায়ই দূষণের তালিকার শীর্ষে থাকা Kolkata আজ অবস্থান করছে অনেক নিচে, ৩৭তম স্থানে, যেখানে বায়ুর মানও মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে।
পাকিস্তানের শহরগুলোর অবস্থানও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য। Lahore ১০৭ স্কোর নিয়ে রয়েছে ১২তম স্থানে, যা সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত। অপরদিকে Karachi-এর স্কোর ৮১, যা মাঝারি পর্যায়ে পড়ে এবং তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক।
চীনের বেশ কয়েকটি শহরও দূষণের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে Chengdu ১৬৭ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পড়ে। এছাড়া Wuhan, Hangzhou, Guangzhou, Shenzhen, Chongqing এবং Beijing-এর মতো শহরগুলোও বিভিন্ন মাত্রার দূষণ নিয়ে তালিকায় অবস্থান করছে।
বায়ুমানের এই সূচক বা একিউআই সাধারণত শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে তা ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত থাকলে সেটি মাঝারি বা সহনীয় ধরা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ হলে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বায়ুমান সাময়িকভাবে উন্নত হলেও এটি স্থায়ী সমাধানের ইঙ্গিত নয়। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা, যা দেখায় যে সঠিক পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার নির্গমন—এসবই ঢাকার দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
এই পরিস্থিতিতে পরিবেশবিদরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, শুধুমাত্র মৌসুমি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন উন্নয়ন, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে বায়ুমানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের জন্য দূষিত বায়ু বিশেষভাবে ক্ষতিকর। তাই বায়ুমানের এই সাময়িক উন্নতিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোনোর এখনই সময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকার বাতাসে যে স্বস্তির আভাস মিলছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এই স্বস্তি ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর উদ্যোগ। অন্যথায়, এই উন্নতি ক্ষণস্থায়ী হয়ে আবারও পুরনো সংকট ফিরে আসতে পারে।