জ্বালানি দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যে অস্থিরতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ এসে আঘাত হানতে শুরু করেছে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। রাজধানীজুড়ে বাজারে বাজারে এখন এক ধরনের অস্থিরতা, যেখানে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে পণ্যের দাম। ক্রেতাদের কণ্ঠে উদ্বেগ, ব্যবসায়ীদের ভাষায় অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির নিচু স্তরে তৈরি হয়েছে চাপের এক নতুন বাস্তবতা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাবুবাজার, নয়াবাজার এবং হাতিরপুল ঘুরে দেখা যায়, বাজারে এখন এক অদৃশ্য চাপ কাজ করছে। পণ্যের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে দাম বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, আর সেই ব্যয় ধীরে ধীরে পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে বলে জানান বিক্রেতারা।

মুদি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া বলেন, কয়েক দিন ধরে তার দোকানে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে দিনে প্রায় লাখ টাকার বিক্রি হতো, এখন অনেক সময় ২০ হাজার টাকাও ছাড়াতে পারছে না। তার কথায়, মানুষের হাতে টাকা কমে গেছে, আর যারা আসছেন তারাও প্রয়োজনের বাইরে কিছু কিনছেন না। বাজারে এক ধরনের মন্দাভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মায়ের দোয়া স্টোরের ব্যবসায়ী ইমাম উদ্দীন বাবলু। তিনি বলেন, অনেক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখনো নতুন দামে পণ্য ছাড়েনি, তবে শিগগিরই দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর পণ্য যেমন মসলা, প্যাকেটজাত দুধ, চা, চিনি ও ডালের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। তার ধারণা, সামনে এই চাপ আরও বাড়বে।

কাঁচাবাজারেও পরিস্থিতি খুব ভিন্ন নয়। কিছুদিন আগে সবজির সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছিল, কিন্তু এখন আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আলু ও ঢ্যাঁড়শ ছাড়া প্রায় সব সবজির দাম ৭০ টাকার ওপরে। কাকরোল, করলা, বেগুন, শজিনা, পটোল—প্রতিটি পণ্যের দামই বেড়েছে। শাক-সবজির দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্য তালিকায়ও পরিবর্তন আসছে।

ধানমন্ডি থেকে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী রিপন মিয়া বলেন, বাজারে এসে মনে হচ্ছে সবকিছুর দাম একসঙ্গে বেড়ে গেছে। একটি ছোট লাউ কিনতে হয়েছে ৭০ টাকায়, আর মুরগির দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তিনি জানান, অভিজাত এলাকার বাজারগুলোতে একই পণ্যের দাম আরও বেশি, যা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মুরগির বাজারেও একই চিত্র। ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি ও দেশি মুরগির দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মাসখানেক আগেও ৩০০ টাকার আশেপাশে থাকা সোনালি মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায়। দেশি মুরগির দাম তো আরও বেশি, যা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।

ডিম ও মাছের বাজারেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ডিমের ডজনে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছের দামও কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এতে করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা কাটেনি। বোতলজাত তেল নির্ধারিত দামে বিক্রি হলেও খোলা তেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। একইভাবে পাম তেলের দামও বেড়েছে। চালের বাজার আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, খুব শিগগিরই চালের দামেও প্রভাব পড়বে।

চালের ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রাক ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একটি ট্রাকে চাল আনতে নির্দিষ্ট খরচ হতো, এখন সেই খরচ কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে চালের দাম বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে পোলাও চালের দাম কিছুটা বেড়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে, যা পরিবারের মাসিক ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও অনেক জায়গায় বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি জ্বালানির খরচও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ায়, যার প্রভাব ধাপে ধাপে সব পণ্যে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত এবং সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com