রুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ঘিরে উত্তেজনায় বন্ধ ক্লাস-পরীক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
রুয়েট ছাত্ররাজনীতি বিক্ষোভ উত্তেজনা

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ঘিরে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রকাশ্য ও গুপ্ত সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। অন্যদিকে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে রাজনীতি চালু রাখার দাবিতে পাল্টা অবস্থান নিয়েছে। দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে রুয়েটের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা সেখানে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন এবং ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় মিছিল নিয়ে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। দুই পক্ষের এই সমান্তরাল কর্মসূচি ক্যাম্পাসে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি করে।

এর আগে রবিবার রাতে একটি ব্যানারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ‘নো পলিটিক্স’ শিরোনামে একটি ব্যানার টানানো হয়েছিল, যেখানে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মী ওই ব্যানারটি খুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন, যা পরে জিয়া হলের সামনে গিয়ে ছাত্রদলের পাল্টা বিক্ষোভের মুখে পড়ে। এতে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রমেও। সোমবার সকাল থেকেই অধিকাংশ বিভাগে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তা শঙ্কায় ক্লাসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করে।

বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন। তারা চান, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনের আলোকে যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ছিল, সেটি কীভাবে পুনরায় চালু হলো, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে তারা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এছাড়া তারা অভিযোগ করেছেন, যারা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টি করে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধানে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের কথা থাকলেও ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তাই তারা মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি চালু রাখার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা এটিকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখছেন এবং দাবি করছেন, রাজনৈতিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেশ চাপে রয়েছে। রুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক রবিউল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রশাসন বিষয়টি সমাধানের জন্য কাজ করছে। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রজ্ঞাপনের আলোকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রাখতে চায়, অন্যদিকে সংবিধানের ভিত্তিতে ছাত্রদল রাজনীতি চালু রাখতে চাচ্ছে। আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করছি।”

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে তা আরও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। অতীতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রুয়েট প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চার জায়গা, যেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি থাকা বা না থাকা—উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অরাজকতা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে অভিভাবকরাও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা চান, তাদের সন্তানরা যেন নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে। তাই দ্রুত সমস্যার সমাধান করে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বর্তমানে রুয়েট ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে রুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ইস্যুতে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ও রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল পরিস্থিতির সমাধান করতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত