সম্পত্তি বিরোধে দাদিকে কুপিয়ে হত্যা, নাতি আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
সম্পত্তি বিরোধে দাদিকে কুপিয়ে হত্যা, নাতি আটক

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় এক মর্মান্তিক পারিবারিক ট্র্যাজেডি গোটা এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে নিজ দাদিকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে নাতির বিরুদ্ধে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাতের এই ঘটনাটি উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের জাটিয়া গ্রামে ঘটে, যেখানে ৭৫ বছর বয়সী আয়েশা বেগম নিজের বাড়ির উঠানেই নির্মমভাবে প্রাণ হারান। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত নাতি জসিম উদ্দিনকে (২৬) গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, আয়েশা বেগমের সঙ্গে তার নাতি জসিম উদ্দিনের পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। পরিবারে জমিজমা নিয়ে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়, তবে এই বিরোধ ধীরে ধীরে তীব্র রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে দাদির ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন যাতে তিনি তার নামে জমি লিখে দেন। এর পাশাপাশি মাদক কেনার জন্য টাকা চাওয়ার বিষয়টিও পারিবারিক কলহকে আরও জটিল করে তোলে।

ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর এই বিরোধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জসিম উদ্দিন দাদির কাছে জমি লিখে দেওয়া এবং টাকা দেওয়ার দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন। কিন্তু আয়েশা বেগম তা প্রত্যাখ্যান করলে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে জসিম ঘরে থাকা একটি ধারালো দা নিয়ে দাদির ওপর হামলা চালান। আঘাতের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আয়েশা বেগম।

এই নির্মম ঘটনার সময় আশপাশের মানুষ ছুটে এলেও জসিমের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকায় কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার পর জসিম উদ্দিন অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন এবং তার হাতে থাকা দা দেখে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাবাসীর সহায়তায় তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।

ফুলপুর থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পুরো বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে, যাতে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও আঘাতের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নৃশংস ঘটনা। তিনি বলেন, পারিবারিক বিরোধ কখনোই এভাবে সহিংসতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়। আইন অনুযায়ী দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ইতোমধ্যে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, আয়েশা বেগম ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও সদালাপী একজন মানুষ। জীবনের শেষ বয়সে এসে নিজের পরিবারের একজন সদস্যের হাতে এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। স্থানীয়দের অনেকেই এই ঘটনাকে সামাজিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। এর সঙ্গে যদি মাদকাসক্তি বা অর্থনৈতিক সংকট যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান না হয়ে ব্যক্তিগত সংঘর্ষে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব যদি সময়মতো সমাধান না করা হয়, তাহলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহল এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সহায়তার সহজলভ্যতার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনায় জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি আছে কি না তাও খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা এবং তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অভিযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পারিবারিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ এবং সহনশীলতার অভাব যখন চরমে পৌঁছে যায়, তখন তা এমন নির্মম ঘটনার জন্ম দেয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত