ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। জরাজীর্ণ, ফাটলধরা, মরিচাধরা রড বের হয়ে থাকা একটি ভবনের ভেতরেই প্রতিদিন বসছে ছোট ছোট শিশুদের ক্লাস। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানেন ঝুঁকি আছে, অভিভাবকেরা আতঙ্কে থাকেন, তবুও শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই। কারণ বিকল্প নেই। বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ঠেকে একটি স্কুল আজ দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার কিনারায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের ৭১ নম্বর গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির প্রতিটি ইঞ্চি যেন বিপদের বার্তা দিচ্ছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও সেই ফাটল এতটাই গভীর যে ভেতরের মরিচাধরা রড চোখে পড়ে। ছাদের বিভিন্ন অংশে গর্ত হয়ে গেছে, আর বৃষ্টির সময় সেখান দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষে জমে থাকে। ফলে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে স্যাঁতসেঁতে ও অস্বাস্থ্যকর।

বিদ্যালয়টির ইতিহাসও দীর্ঘ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বহু প্রজন্মের শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে। পরে ১৯৬৮ সালে সরকারিভাবে একটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ভবনের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যথাযথ সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের অভাবে আজ তা একপ্রকার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। তবুও সেখানে প্রতিদিন চলছে পাঠদান। কারণ বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই, নেই বিকল্প কোনো ব্যবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষকরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ভেতরেই ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথায় উঠে এসেছে ভয় আর অনিশ্চয়তার চিত্র। পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, তারা প্রায়ই আতঙ্কে থাকে। ঝড় বা বৃষ্টি হলে ভয় আরও বেড়ে যায়। কয়েকদিন আগেই ক্লাস চলাকালে ফ্যানসহ ছাদের একটি অংশ ভেঙে তাদের ওপর পড়ে। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় তারা। এই ঘটনার পর থেকে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে ভয় পাচ্ছে। আকাশ মেঘলা হলেই শিক্ষকরা আগেভাগেই ছুটি দিয়ে দেন।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসছে না, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। অভিভাবকেরাও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাদের কাছে সন্তানের জীবনই আগে, এরপর শিক্ষা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক মাস আগে এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেক অভিভাবক ছুটে আসেন বিদ্যালয়ে। এরপর থেকেই ভবনের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। নিয়মিত ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া, দেয়ালে নতুন ফাটল দেখা দেওয়া—এসব ঘটনা যেন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোসা. শারমিন আক্তার জানান, তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। শিক্ষা অফিস থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু নতুন কোনো শ্রেণিকক্ষ বা বিকল্প জায়গা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এখানেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা নিজেরাও ভয় নিয়ে ক্লাস নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্লাস বন্ধ রাখতে পারছি না।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ আক্তার বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু ভয় ও আতঙ্কের কারণে উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। অভিভাবকেরা সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, নিরাপদ ভবন ছাড়া তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। সাম্প্রতিক ঘটনায় ফ্যানসহ ছাদের অংশ ভেঙে পড়ার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা বারবার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ না হলে শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।”

এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টির ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদাপত্রে বিদ্যালয়টির নাম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, খুব শিগগিরই পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই ‘খুব শিগগিরই’ কবে বাস্তবে রূপ নেবে? প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে বসে থাকা শতাধিক শিশুর জীবন কি ততদিন নিরাপদ থাকবে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণও অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি ছোট অবহেলা বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা সেই বাস্তবতারই একটি করুণ উদাহরণ। যেখানে শিক্ষা গ্রহণের জায়গা হওয়া উচিত নিরাপদ ও আনন্দময়, সেখানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা জীবন হাতে নিয়ে ক্লাস করছে। এমন পরিস্থিতি শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন।

এখন প্রয়োজন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিক্ষা যেমন অধিকার, তেমনি নিরাপত্তাও একটি মৌলিক প্রয়োজন। এই দুইয়ের সমন্বয় না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলা হয়ে উঠবে আরও কঠিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত