যুদ্ধই মার্কিন অস্ত্র শিল্পের আয়ের প্রধান উৎস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
যুদ্ধই মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ৯/১১ হামলার পর গত প্রায় আড়াই দশক ধরে দেশটির বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু রাজনৈতিক বা কৌশলগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাত ও অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ড্যান গ্রেজিয়ার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন কার্যত একটি “স্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির” মধ্যে অবস্থান করছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি আকস্মিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ধারাবাহিকতার ফল। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয় একবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে তা থেকে সহজে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানগুলো শুধু সামরিক উপস্থিতি নয়, বরং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক সরবরাহের চাহিদা তৈরি করে। ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা সময়ের সঙ্গে একটি স্থায়ী কাঠামোতে রূপ নেয়।

ড্যান গ্রেজিয়ার তার বক্তব্যে আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এমন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা উচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বড় বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, নীতি নির্ধারক এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা। তার মতে, একবার এই ব্যয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিকে হঠাৎ কমানো বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, উচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয় বজায় রাখার একটি অপ্রকাশিত প্রবণতা হলো নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা বা বাস্তব সংঘাতে জড়িয়ে পড়া। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি প্রতিরক্ষা শিল্পকে লাভবান করে।

বিশ্লেষণে বিশেষভাবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ভূমিকা। লকহিড মার্টিন এবং আরটিএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব কোম্পানি যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করে থাকে। সামরিক সংঘাত বা উত্তেজনার সময় এসব পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা কোম্পানিগুলোর আয় বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংশ্লিষ্ট টানাপোড়েন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘর্ষ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতকে আরও সক্রিয় করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এসব পরিস্থিতিতে ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার ও পুনঃসরবরাহ প্রয়োজন হয়, যা নতুন উৎপাদন চক্র তৈরি করে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, এই ধারাবাহিক সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একটি “মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতি ও কর্পোরেট স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই কাঠামোতে যুদ্ধ শুধু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিও হয়ে দাঁড়ায়।

তবে সমালোচকরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ যুদ্ধ বা সংঘাতের ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামো শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথকে দুর্বল করতে পারে এবং নতুন নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আধুনিক ও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। তাদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, মিত্র দেশগুলোর সহায়তা এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ ব্যবস্থা, যেমন ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার যুদ্ধ, এই খাতকে আরও বিস্তৃত করবে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ড্যান গ্রেজিয়ারের এই মন্তব্য এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি আবারও প্রশ্ন তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতি কি শুধুই নিরাপত্তার জন্য, নাকি এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ, যা যুদ্ধ ও সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত?

বিশ্লেষণগুলো ইঙ্গিত দেয়, এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বহুস্তরীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত, যা ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত