প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকা এখন এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। আগাম বৃষ্টি, শ্রমিকের অভাব এবং ধান কাটার আধুনিক যন্ত্রের ঘাটতি—এই তিন সমস্যার কারণে বোরো ধান ঘরে তোলাকে ঘিরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক। বছরের একমাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনে এবার অনিশ্চয়তা আরও তীব্র আকার নিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের মৌসুমে আগাম বৃষ্টির কারণে মাঠে পানি জমে গেছে। এতে অনেক জমির ধান দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় এবং যন্ত্রের সংকট থাকায় ধান কাটার কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে মাঠে থাকা ফসল নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার হাওরাঞ্চলে ধান কাটার যন্ত্র বা হারভেস্টারের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। যদিও সরকারি কৃষি প্রশাসন এ দাবি পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন জেলা থেকে যন্ত্র ও শুকানোর মেশিন এনে হাওর এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—অনেক কৃষক এখনো প্রয়োজনীয় যন্ত্র সময়মতো পাচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা সরাসরি মাঠে গিয়ে কৃষকদের সহায়তা করছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক সরবরাহে সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, কয়েকটি জেলা থেকে শুকানোর মেশিন এনে বিশেষভাবে সুনামগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে, যাতে দ্রুত ধান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, আগাম বৃষ্টির কারণে দেশের প্রায় ২৮ হাজার ২০১ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এর মধ্যে কয়েক হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক জমিতে ধান দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় অঙ্কুরোদ্গম শুরু হয়েছে, যা ফসলের মান নষ্ট করছে। এতে কৃষকদের ক্ষতির শঙ্কা আরও বেড়েছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, সবচেয়ে বড় সংকট এখন শ্রমিকের অভাব। আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি শ্রমিকরা হাওরে এসে ধান কাটার কাজে অংশ নিতেন। কিন্তু এবার সেই শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কম। ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের ওপর চাপ বেড়েছে এবং শ্রমমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক জায়গায় সময়মতো ধান কাটাই সম্ভব হচ্ছে না।
একজন কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বোরো মৌসুমে আমরা পুরো বছরের খাদ্য নির্ভর করি। কিন্তু এবার বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটে ধান সময়মতো কাটা যাচ্ছে না। আগে বাইরে থেকে শ্রমিক আসতো, এবার তারা আসছে না। ফলে অনেক ধান মাঠেই পড়ে আছে।
হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন এলাকা। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে বোরো ধানই প্রধান ফসল। বছরের একমাত্র এই ফসলের ওপরই এখানকার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। তাই সময়মতো ধান কাটা না গেলে আকস্মিক বন্যা বা বৃষ্টিতে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, হাওরে ধান একসঙ্গে পাকতে শুরু করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ফসল কাটতে হয়। হাতে শ্রমিক দিয়ে এই কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আধুনিক যন্ত্র থাকলেও তা সবার জন্য সহজলভ্য নয়। অনেক কৃষক অভিযোগ করেন, হারভেস্টার বুকিং দিতে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে আবহাওয়া খারাপ হলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যবহারে অগ্রাধিকার নিয়ে অভিযোগও রয়েছে। অনেক কৃষকের দাবি, প্রভাবশালীরা আগে যন্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ পান, ফলে সাধারণ কৃষকরা পিছিয়ে পড়েন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলের কৃষি সংকট নতুন নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফলে আগাম বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। এই অবস্থায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, প্রতি বছরই হাওর এলাকায় কিছু না কিছু ক্ষতি হয়। তবে এবার বড় ধরনের সর্বাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি ধান কাটা হয়ে গেছে। তবে এখনো যেসব জমি পানির নিচে আছে, সেগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সার্বিকভাবে দেশে বোরো ধানের উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি হতে পারে, যা খাদ্য সরবরাহ ও বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি বড় ধরনের সংকটে রূপ নেবে না বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিপুল পরিমাণ জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ জমির ফসল ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। তবে বাকি অংশ দ্রুত কাটতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এখন এক কঠিন সময় পার করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শ্রমিক সংকট এবং যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে তাদের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।