প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে দেশের শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শ্রমিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করলেও বাস্তবে তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি ১৮৮৬ সালের ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট স্কয়ারে দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেই আন্দোলনে শ্রমিকদের রক্তে ভিজেছিল রাজপথ। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আজ বিশ্বব্যাপী মে দিবস পালিত হচ্ছে।
তিনি শহীদ শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মৃতি বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার উৎস। তবে একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে মে দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
তার মতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে মে দিবস পালিত হলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে অতীত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং হয়রানির অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি রানা প্লাজা ধসের দীর্ঘ বিচারহীনতার বিষয়টিও উল্লেখ করেন, যা এখনো শ্রমিক আন্দোলনের একটি বড় দুঃখজনক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ হয়নি, যা শ্রমিকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা রক্ত দিয়ে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল। তবে বাস্তবতায় সেই পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বৈষম্য কমানো এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
তার মতে, একটি শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, যেখানে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত থাকবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অবদান ছাড়া কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই তাদের জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশই শ্রমনির্ভর। পোশাক শিল্প, নির্মাণ খাত, কৃষি ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি শ্রমিক কাজ করছেন। তবে তাদের আয়, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। ফলে শ্রমিক আন্দোলন ও অধিকার নিয়ে আলোচনা প্রতি বছরই মে দিবসে নতুন করে সামনে আসে।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন করা জরুরি। ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শ্রম আইন কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মে দিবসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য প্রায়ই একই ধরনের হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে একটি ন্যায্য ও সমানাধিকারভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান, যেখানে শ্রমিকদের মর্যাদা কেবল কথায় নয়, বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হবে।
সব মিলিয়ে মে দিবসকে ঘিরে তার এই মন্তব্য আবারও শ্রমিক অধিকার, মজুরি বৈষম্য এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের বাস্তব জীবনের পরিবর্তন কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে নীতিগত পদক্ষেপ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।