প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্য উৎপাদন উপকরণ এবং শিল্পধাতুর দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছরে জ্বালানি পণ্যের দাম গড়ে প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের “কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় দৈনিক প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে, যেখানে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা শুরু করেছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৮৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে চলতি বছরে এর গড় মূল্য ছিল ৬৯ ডলার। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ১১৫ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পরিবহন, উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ খাতে পড়বে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে সার উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সার বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। আগামী বছরে সারের দাম গড়ে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতে এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনসহ বিভিন্ন শিল্পধাতুর বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এসব ধাতু নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস এবং শিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়লে সামগ্রিক উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ছে, যা দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, এসব পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা পূর্বের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো। তা না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক ইস্যু নয়, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। জ্বালানি থেকে শুরু করে খাদ্য ও শিল্প খাত—সবখানেই এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।