গর্ভপাতের পর ভবিষ্যৎ গর্ভধারণ নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬
  • ৮ বার
গর্ভপাতের কতদিন পর সন্তান নেওয়া যায়

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গর্ভপাত একটি সংবেদনশীল এবং মানসিকভাবে কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা। অনেক নারীর জন্য এটি শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং মানসিক আঘাতেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে প্রথমবার গর্ভপাত হলে অধিকাংশ পরিবারেই উদ্বেগ, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেক নারী মনে করেন, হয়তো আর কখনো মা হওয়া সম্ভব হবে না। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভপাতের পর পুনরায় সুস্থভাবে সন্তান ধারণ করা সম্ভব এবং সঠিক যত্ন ও পরামর্শ অনুসরণ করলে ভবিষ্যতে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভপাতের পর নারীর শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। এই সময়টাতে শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গর্ভপাতের পর হরমোনগত পরিবর্তন, রক্তক্ষরণ এবং মানসিক চাপ মিলিয়ে শরীরে একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভপাতের পরপরই সহবাস না করাই ভালো। কারণ এ সময় জরায়ুমুখ কিছুটা খোলা থাকে এবং শরীর সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। সাধারণত গর্ভপাতের লক্ষণ পুরোপুরি সেরে যাওয়ার পর সহবাস নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। এ জন্য অন্তত দুই সপ্তাহ সহবাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে এই সময় ট্যাম্পন বা মিন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার না করার পরামর্শও দেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ এতে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়তে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, গর্ভপাতের প্রায় দুই সপ্তাহ পর থেকেই একজন নারী পুনরায় গর্ভধারণ করতে পারেন। তবে কবে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত, তা নির্ভর করে নারীর শারীরিক অবস্থা, বয়স, পূর্বের গর্ভধারণের ইতিহাস এবং গর্ভপাতের কারণের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গর্ভপাতের পর অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করে পুনরায় গর্ভধারণ করলে মা ও শিশুর জন্য তুলনামূলক ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় মাসের আগেও গর্ভধারণ করলে অনেক ক্ষেত্রে সফল ও নিরাপদ গর্ভাবস্থা সম্ভব হয়েছে।

এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভপাতের পর শরীর পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে কিনা এবং ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের জন্য শরীর প্রস্তুত কিনা—তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাতের কারণ নির্ণয় করতে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।

সাধারণত গর্ভপাতের চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে মাসিক পুনরায় শুরু হয়। তবে শুরুতে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে এবং স্বাভাবিক চক্রে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। চিকিৎসকেরা মনে করেন, অন্তত একবার স্বাভাবিক মাসিক হওয়ার পর গর্ভধারণের চেষ্টা করলে গর্ভধারণের সময় নির্ধারণ এবং গর্ভকাল হিসাব করা সহজ হয়।

এদিকে যারা গর্ভপাতের পরপরই সন্তান নিতে চান না, তাদের জন্য দ্রুত কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ শরীর পুনরায় গর্ভধারণের সক্ষমতা দ্রুত ফিরে পেতে পারে।

গর্ভপাত প্রতিরোধের বিষয়েও সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। যদিও সব গর্ভপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তবুও কিছু জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

গর্ভধারণের আগে ‘প্রি-কনসেপশন চেকআপ’কে বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চেকআপের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা নারীর শারীরিক অবস্থা, পূর্বের গর্ভধারণের ইতিহাস, পারিবারিক রোগের ঝুঁকি এবং চলমান ওষুধ ব্যবহারের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্তচাপ ও ওজন পরীক্ষা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এতে আগে থেকেই কোনো জটিলতা থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসও নিরাপদ গর্ভধারণের অন্যতম শর্ত। চিকিৎসকদের মতে, ফলমূল, শাকসবজি, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে এবং গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার আগেই ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করলে অনেক জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমে যায়।

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতাও গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মাধ্যমে স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মানসিক সুস্থতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। গর্ভপাতের পর হতাশা, ভয় বা আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অনেক নারী এই সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাই পরিবার ও স্বজনদের সহানুভূতিশীল আচরণ এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একইসঙ্গে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, ধূমপান, মদ্যপান এবং মাদকাসক্তি গর্ভধারণ ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য ক্ষতিকর বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকেরা। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এসব অভ্যাস প্রজনন সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সংক্রমণ প্রতিরোধেও বিশেষ সতর্কতা জরুরি। গর্ভাবস্থায় কাঁচা বা আধাসেদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুকে অনেক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গর্ভপাত জীবনের শেষ নয়। অধিকাংশ নারীই পরবর্তীতে সফলভাবে সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হন। সঠিক চিকিৎসা, মানসিক সমর্থন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের মাতৃত্বকে নিরাপদ ও আনন্দময় করে তোলা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত