প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই আশার বার্তা দিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, সরকারের চলমান বিশেষ উদ্যোগ, জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং ভ্যাকসিন কার্যক্রমের কারণে আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সব জেলা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর বনানীতে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি, শিশুদের রোগপ্রবণতা এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত ওই সেমিনারে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যখাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় শিশুদের জ্বর, কাশি, ঠান্ডা ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু হাসপাতাল ও ডেডিকেটেড মেডিকেল ইউনিটগুলোতে বেড সংকটও দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু করেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে আরও নতুন ওয়ার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সংক্রমণ যাতে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সে জন্য দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, একটি ভ্যাকসিন শরীরে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাধারণত তিন সপ্তাহ সময় নেয়। তবে সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপের কারণে সংক্রমণের গতি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু চিকিৎসা দিচ্ছি না, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। টিকাদান কার্যক্রম বাড়ানো, সচেতনতা তৈরি এবং হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার মাধ্যমে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।”
এ সময় তিনি আসন্ন ডেঙ্গু মৌসুম নিয়েও সতর্কবার্তা দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম পরিস্থিতির পাশাপাশি ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আলাদা ইউনিট প্রস্তুত রাখা, ওষুধ ও স্যালাইনের মজুত বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, দেশে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে অপুষ্টি, নিউমোনিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, “একটি শিশুর জন্য মায়ের দুধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। কিন্তু নানা সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত পরিবর্তনের কারণে অনেক মা শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বাড়লে শুধু হাম নয়, যেকোনো সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই পরিবারগুলোকে শিশুদের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, তারা পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন মজুত রেখে যায়নি। ফলে বর্তমান সরকারকে শুরুতেই সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে তিনি জানান, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিদেশি দাতা সংস্থা ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ৬ মে দেশে বড় আকারের একটি ভ্যাকসিন চালান পৌঁছাবে। এর মাধ্যমে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করা হবে। হাম পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেই দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সময়মতো টিকা না নিলে সংক্রমণ মারাত্মক আকার নিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে বা আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, তাদের জন্য হাম প্রাণঘাতী হতে পারে।
চিকিৎসকরা আরও বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজকেও সচেতন হতে হবে। শিশুর জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
সেমিনারে অংশ নেওয়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও সংক্রামক রোগের ধরন বদলে যাচ্ছে। কখনো অতিরিক্ত গরম, কখনো হঠাৎ বৃষ্টি— এমন আবহাওয়ার কারণে ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পুষ্টি সচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতেই হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের আশাবাদী অবস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমেই হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।