প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যখন প্রতিদিনই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, তখনই নতুন করে দেখা দিয়েছে রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় সংকট। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একমাত্র পরীক্ষাগারে হামের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কীট স্বল্পতায় তৈরি হয়েছে ধীরগতি, যার ফলে জমে গেছে হাজার হাজার নমুনা।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মো. মমিনুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে পরীক্ষাগারে সীমিত সংখ্যক কীট রয়েছে, যা দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে হাতে থাকা কীট দিয়ে আনুমানিক এক হাজারের কিছু বেশি নমুনা পরীক্ষা করা যাবে, অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন শতাধিক নমুনা জমা পড়ছে।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পরীক্ষার জন্য প্রায় সাত হাজারের বেশি নমুনা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এতে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তবে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কীট এসে পৌঁছাবে।
ডা. মমিনুর রহমান আরও জানান, ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে কীটের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে আরও কীট পাওয়া যাবে, যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি দুই-এক দিনের মধ্যেই কিছু অতিরিক্ত কীটও আসার কথা রয়েছে, যা তাৎক্ষণিক চাহিদা কিছুটা পূরণ করবে।
তবে ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা গেছে, সংকটটি সাময়িক হলেও এর প্রভাব বড় আকারে পড়ছে। কারণ দেশের একমাত্র এই পরীক্ষাগারেই হামের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পুরো চাপ এককেন্দ্রিকভাবে এই প্রতিষ্ঠানের ওপরই পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগ শনাক্ত না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হামের মতো সংক্রামক রোগে দেরিতে শনাক্ত হলে শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ে এবং মৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে হামের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে দুই শিশুর ক্ষেত্রে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, বাকিদের ক্ষেত্রে উপসর্গ ছিল। মৃতদের মধ্যে ঢাকায় দুইজন, খুলনা ও রাজশাহীতে একজন করে এবং সিলেটে দুইজন শিশু রয়েছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণে মোট ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ জন শিশুর মৃত্যুর কারণ সরাসরি হাম হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়সীমায় ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ সময়মতো শনাক্ত না হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু কীট সরবরাহ নয়, ভবিষ্যতে বিকল্প পরীক্ষাগার এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এতে করে একক কেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হামের মতো রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিকা গ্রহণে কিছু ঘাটতি দেখা যাওয়ায় সংক্রমণ বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে কীট সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি, মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরীক্ষাগারে কীট সংকট—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এখন দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।