প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও বাস্তবমুখী করে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদির সৌজন্য সাক্ষাৎকে ঘিরে শিক্ষা অঙ্গনে এমনই ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ এবং শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষাখাতের সংস্কার ও আধুনিকায়নে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সফল শিক্ষা মডেল নিয়ে এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। এ প্রেক্ষাপটে থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য কি না, সেটি যাচাইয়ের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।
বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বহু বিদ্যালয় ভালো ফলাফল করছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ঘাটতি শিক্ষা ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কার্যকর কৌশলগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ উপযোগী মডেল গ্রহণ করতে আগ্রহী। বিশেষ করে বিদ্যালয়ভিত্তিক নেতৃত্ব উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আবার অনেক শিক্ষক নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না। ফলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদি বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সত্যিই ইতিবাচক উদ্যোগ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখার মান বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদ্যালয় পরিচালনায় কার্যকর নেতৃত্ব তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশ যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, থাইল্যান্ড শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে আগ্রহী। থাই শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে বলেও তিনি মত দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড শিক্ষার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশটি বিভিন্ন সফল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার মান আরও উন্নত হতে পারে।
এদিকে বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আতিকুর রহমান এবং থাইল্যান্ড দূতাবাসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আরও নিয়মিত বৈঠক এবং পর্যবেক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিকল্প নেই। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে উন্নত মডেল অনুসরণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে তারা বলছেন, শুধু বিদেশি মডেল অনুসরণ করলেই হবে না, বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী তা প্রয়োগ করতে হবে। শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য, শিক্ষক সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুফল সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, থাইল্যান্ডের সঙ্গে এই সহযোগিতামূলক আলোচনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে নেতৃত্বভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।