ফুটবল ইতিহাসের সেরা একাদশে জায়গা পেলেন না মেসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
ফুটবল ইতিহাসের সেরা একাদশে জায়গা পেলেন না মেসি

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবল ইতিহাসে ‘সর্বকালের সেরা’ কে—এই বিতর্ক যেন কখনো শেষ হওয়ার নয়। যুগে যুগে অসংখ্য কিংবদন্তির আবির্ভাব ঘটেছে, আবার তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে অসীম আবেগ, তুলনা ও মতভেদ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পুরোনো বিতর্কে নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টার Piers Morgan। নিজের পছন্দের সর্বকালের সেরা ফুটবল একাদশ প্রকাশ করে তিনি জায়গা দেননি Lionel Messiকে। শুধু তাই নয়, তিনি দাবি করেছেন মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসেরও সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় নন। আর এই মন্তব্য ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেসির নাম শুধু একজন ফুটবলারের নয়, বরং এক যুগের প্রতীক। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে অসংখ্য রেকর্ড, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণ এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে অনেকের চোখে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু পিয়ার্স মরগানের দৃষ্টিতে সেই তালিকায় মেসির অবস্থান অনেক নিচে।

এই ব্রিটিশ উপস্থাপক বরাবরই Cristiano Ronaldoর প্রতি নিজের সমর্থনের কথা খোলাখুলিভাবে বলে এসেছেন। বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপের আগে রোনালদোর দেওয়া তার বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকার বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। সেই সাক্ষাৎকারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, কোচ এবং ক্লাব পরিচালনা নিয়ে রোনালদোর বিস্ফোরক মন্তব্যের প্ল্যাটফর্ম ছিলেন মরগান। এরপর থেকেই রোনালদো-মেসি বিতর্কে তাকে একপক্ষীয় সমর্থক হিসেবেই দেখেন অনেক ফুটবলভক্ত।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘ফুটবলফানিজ’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট মরগানের নির্বাচিত সর্বকালের সেরা একাদশ প্রকাশ করে। সেই একাদশে জায়গা পেয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের বহু কিংবদন্তি। দলে ছিলেন Gordon Banks, Cafu, Franco Baresi, Paolo Maldini, Roberto Carlos, Zinedine Zidane, Lothar Matthäus, Ronaldinho, Diego Maradona, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং Ronaldo Nazário। কিন্তু এই তারকাখচিত তালিকায় অনুপস্থিত ছিলেন লিওনেল মেসি।

পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল প্রতিক্রিয়া। অনেকেই অবাক হয়ে প্রশ্ন তোলেন, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের একজনকে কীভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব। জবাবে মরগান নিজেই পোস্টটি শেয়ার করে লেখেন, “এতটা বিস্ময়কর নয়। মেসি তো আর্জেন্টিনারও সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় নয়। তাকে ছাড়াই আমার সর্বকালের একাদশ নিখুঁত।”

তার এই মন্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফুটবলভক্তদের বড় একটি অংশ মরগানের বক্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যা দেন। অনেকেই মনে করেন, রোনালদোর প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থনের কারণেই তিনি মেসিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, সর্বকালের সেরা একাদশ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং এখানে ভিন্নমত থাকতেই পারে।

বিশেষ করে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে এই মন্তব্য ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কারণ মেসি শুধু বিশ্বকাপ জিতেছেন তা-ই নয়, জাতীয় দলের হয়ে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড অর্জনের মাধ্যমে দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। অনেকের মতে, মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

তবে মরগান যে নামটি মেসির ওপরে রেখেছেন, সেই Diego Maradona আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে এখনও এক আবেগের নাম। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় দেশটির মানুষের কাছে প্রায় পৌরাণিক মর্যাদা পেয়েছে। তার অসাধারণ দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং বিতর্কিত জীবন—সবকিছু মিলিয়ে ম্যারাডোনা আজও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে বিশাল এক অধ্যায়। ফলে কিছু সমর্থক এখনও মনে করেন, ম্যারাডোনার প্রভাব ও ব্যক্তিত্ব মেসির চেয়েও বড়।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের তুলনা আসলে ভিন্ন প্রজন্ম, ভিন্ন সময় এবং ভিন্ন বাস্তবতার খেলোয়াড়দের এক কাতারে দাঁড় করায়। ম্যারাডোনা খেলেছেন এমন এক সময়ে, যখন ফুটবল ছিল অনেক বেশি শারীরিক ও কঠিন। অন্যদিকে মেসি আধুনিক যুগে প্রযুক্তি, কৌশল ও উচ্চগতির ফুটবলের মধ্যে নিজেকে সেরা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই কে বড়—এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসিভক্তরা মরগানের মন্তব্যের জবাবে মেসির অর্জনের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেছেন। বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি’অর, গোলসংখ্যা, অ্যাসিস্ট এবং ক্লাব পর্যায়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের কথা উল্লেখ করে তারা বলছেন, পরিসংখ্যান ও সাফল্যের বিচারে মেসিকে উপেক্ষা করা বাস্তবতাবিবর্জিত। আবার রোনালদোভক্তদের একটি অংশ মরগানের পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, ফুটবলে ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা থাকবেই এবং সেটি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই।

ফুটবলের ইতিহাসে ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্ক নতুন কিছু নয়। একসময় Pelé ও ম্যারাডোনাকে নিয়ে তর্ক ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। পরে সেই আলোচনায় যুক্ত হন মেসি ও রোনালদো। প্রজন্ম বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছে, কিন্তু বিতর্কের আবেগ কমেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই আলোচনা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের অংশগ্রহণে তা নতুন মাত্রা পায়।

শেষ পর্যন্ত, পিয়ার্স মরগানের মন্তব্য হয়তো আবারও মনে করিয়ে দিল ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়। এটি আবেগ, স্মৃতি, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসেরও একটি বিশাল জগৎ। এখানে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অনুভূতিরও মূল্য রয়েছে। আর সেই কারণেই হয়তো ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্ক কখনোই শেষ হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত