প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ আবারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
রাজধানীর মহাখালী এলাকায় অবস্থিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের বহির্বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সকালে থেকেই অসংখ্য অভিভাবক তাদের অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। অনেক শিশুর শরীরে লাল র্যাশ, জ্বর, বমি এবং খাওয়ায় অনীহাসহ জটিল উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানো অনেক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে এলেও ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগ করছেন একাংশ অভিভাবক।
একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পরও অনেক সময় চিকিৎসকেরা শিশুদের ভর্তি নিচ্ছেন না। এতে তারা আরও দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বেড সংকট নেই। রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেই ভর্তি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেসব শিশুর শারীরিক অবস্থা জটিল, তাদের দ্রুতই ভর্তি করা হচ্ছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, হামের রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকেরা জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন ধরন বা পরিবর্তিত রূপ আছে কি না, তা নিয়েও পর্যবেক্ষণ চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে টিকা গ্রহণে ঘাটতি। অনেক শিশু সময়মতো টিকা না পাওয়ায় তাদের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা গ্রহণে গাফিলতি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তারা আরও সতর্ক করে বলেছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সময়মতো টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকা গ্রহণে সামান্য দেরিও শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকেরা অভিভাবকদের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, শিশুর শরীরে জ্বর, র্যাশ বা খাওয়ায় অনীহা দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে না বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ অব্যাহত থাকলে সেবা প্রদানে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে এমন পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করে বলেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। তিনি মনে করেন, এখনই যদি সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা রোগীদের সেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হচ্ছে। তবুও জরুরি অবস্থায় থাকা শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অভিভাবকেরা মানসিক চাপের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কারণে তারা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। সন্তানদের দ্রুত সুস্থতা কামনায় তারা চিকিৎসকদের সহযোগিতা কামনা করছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হামের সংক্রমণ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত বিস্তার এবং হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।