প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অন্তত ২২৮টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। তবে এই দাবি ঘিরে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই বা স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান জানাচ্ছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় বুধবার, যেখানে বলা হয়, ইরান মূলত ড্রোন ও সমন্বিত আক্রমণ কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এসব হামলায় হ্যাঙ্গার, ব্যারাক, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, সামরিক বিমান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওয়াশিংটন পোস্ট দাবি করে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পূর্বে ধারণার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান এই হামলাগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে কিছু সামরিক ঘাঁটিতে ব্যবহৃত রাডার এবং বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যা সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যে আরও উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি মার্কিন কেসি-১৩৫ স্টার্টোট্যাঙ্কার বিমান রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রায় ৪০ থেকে ৫২ মিলিয়ন ডলারের এই বিমানটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। যদিও এর প্রকৃত অবস্থা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটার বরাতে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়। একই সঙ্গে সিএনএনসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ এসব দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত কয়েক ডজন সামরিক বিমান বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান এবং পরিবহন বিমানও রয়েছে বলে দাবি করা হলেও এসব তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যেসব তথ্য প্রচারিত হচ্ছে তা অতিরঞ্জিত বা আংশিক হতে পারে। তাদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন এবং অনেক সময় প্রাথমিক তথ্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তারা আরও জানান, প্রকৃত মূল্যায়ন যুদ্ধ শেষে বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জানা যাবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড কিছু ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েন কৌশল পরিবর্তন করেছে এবং কিছু বাহিনীকে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি অঞ্চলে সামরিক কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পুনরুদ্ধার এবং নতুন সামরিক সরবরাহ পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে পেন্টাগন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বড় ধরনের বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যয় বৃদ্ধি শুধু সামরিক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মার্কিন সামরিক মুখপাত্ররা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতিকে “বিপর্যয় বা বড় ব্যর্থতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এমন ক্ষতি স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা দ্রুত পুনরুদ্ধারযোগ্য। তারা আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই উত্তেজনা শুধু সামরিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।