সর্বশেষ :

মাইলস্টোন দুর্ঘটনা মামলা ঘিরে তোলপাড়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ১০ বার
মাইলস্টোন স্কুলে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ী এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় দায় ও অবহেলার অভিযোগ তুলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়েছে। এই আবেদনকে কেন্দ্র করে বিচারাঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, যেখানে ঘটনাটির দায় নির্ধারণ, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম আরিফুল ইসলামের আদালতে নিহত এক শিক্ষার্থীর বাবা উসাইমং মারমা এই মামলার আবেদন দাখিল করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার সন্তানসহ বহু মানুষ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেও সঠিক তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হয়নি। আবেদনটি আদালতে উপস্থাপিত হওয়ার পর বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মামলার আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ২১ জুলাই, যখন প্রতিদিনের মতো শিক্ষার্থীরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে প্রশিক্ষণ বিমান এফ-৭ বিজিআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে, যা পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধ্বস্ত হয়। আবেদনে বলা হয়, বিমানটি পরিচালনার সময় ত্রুটি এবং প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি ছিল, যার ফলে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষিকা, তিনজন অভিভাবক এবং একজন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি নিহত হন। একইসঙ্গে আরও ১৭০ জনের বেশি মানুষ দগ্ধ ও আহত হয়ে স্থায়ীভাবে শারীরিক ক্ষতির শিকার হন বলেও উল্লেখ করা হয়। যদিও এই পরিসংখ্যান এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, এটি মামলার আবেদনের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

আবেদনকারীর দাবি, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবহেলা, নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানের ঘাটতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে মামলায় ১২ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়, তৎকালীন সময়ে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর নীতিগত তদারকির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রশাসনিক দায় তার ওপর বর্তায়।

একই মামলায় আরও যাদের আসামি করার আবেদন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনিক এবং সামরিক কর্মকর্তারা। আবেদনে আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা, প্রেস সচিব, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজউকের চেয়ারম্যানসহ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

আবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পূরণ করা হয়নি। আবেদনকারী দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এটি দায়িত্বহীনতার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মামলার আবেদনে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রশিক্ষণ বিমানটির প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং নিয়ন্ত্রণ ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, নবীন পাইলটের একক উড্ডয়ন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এই দুর্ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং এটি শুধুমাত্র আবেদনকারীর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত।

ঘটনার পর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, দুর্ঘটনার পর যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের মামলার আবেদন আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রাথমিক তদন্ত ও প্রমাণ উপস্থাপনের ওপর। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক মহল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই মামলার আবেদন ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি একটি গুরুতর মানবিক ঘটনার বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া, আবার কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা যায়।

ঢাকা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকায় এমন একটি দুর্ঘটনা এবং তার পরবর্তী আইনি জটিলতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এখন নতুন করে এই মামলা আবেদন সেই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে।

ঘটনাটিকে ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে অগ্রসর হবে, আদালত মামলাটি গ্রহণ করবে কি না এবং তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, তা নিয়ে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, বিমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে মাইলস্টোন দুর্ঘটনা নিয়ে এই মামলার আবেদন শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই মামলার ভবিষ্যৎ পথরেখা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত