কফিনে ফিরল বৃষ্টি, স্তব্ধ স্বজন-সহপাঠীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
কফিনে ফিরল বৃষ্টি, স্তব্ধ স্বজন-সহপাঠীরা

প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ অবশেষে দেশে এসে পৌঁছেছে। স্বপ্নভরা এক তরুণীর কফিনবন্দি নিথর দেহ যখন ঢাকার মাটিতে নামে, তখন বিমানবন্দরের বাতাসজুড়ে ছিল কান্না, শোক আর স্তব্ধতা। পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ, সহপাঠীদের অশ্রুসিক্ত চোখ এবং প্রিয়জনদের নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন এক বেদনাঘন পরিবেশে পরিণত হয়।

শনিবার (৯ মে) সকাল সোয়া ৯টার দিকে Hazrat Shahjalal International Airport-এ এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ইকে-০৫৮২ বৃষ্টির মরদেহ নিয়ে অবতরণ করে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে দুবাই হয়ে ঢাকায় আসে তার কফিন। বিমানবন্দরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বৃষ্টির বাবা-মা, স্বজন ও সহপাঠীরা। প্রিয় কন্যার মরদেহ গ্রহণের মুহূর্তে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা-বাবা। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন, সেই মেয়েই আজ কফিনবন্দি হয়ে ফিরল দেশে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী Shama Obaed Islam মরদেহ গ্রহণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অনেকে বারবার বলছিলেন, “এভাবে তো ফেরার কথা ছিল না বৃষ্টির।”

পরিবার ও সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রাণবন্ত ও স্বপ্নবাজ একজন শিক্ষার্থী। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তার স্বপ্ন ছিল গবেষণার মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু করা, পরিবারের ভাগ্য বদলানো এবং নিজেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে থেমে গেল।

স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ ছিলেন বৃষ্টি। পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে গর্ব করতেন। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার সুযোগ পাওয়ার পর পুরো পরিবার আনন্দে ভেসে যায়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই আনন্দ রূপ নেয় শোকে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের Orlando International Airport থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বৃষ্টির মরদেহ ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ট্রানজিট শেষে আরেকটি ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে। পুরো যাত্রাপথজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

এর আগে গত সোমবার একইভাবে ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী Jamil Ahmed Limon-এর মরদেহও দেশে আনা হয়। দুই তরুণ গবেষকের মৃত্যু বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন এবং প্রবাসী সমাজে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যেও বৃষ্টি ও লিমনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে মানবিক উদ্যোগ নেয় University of South Florida। বিশ্ববিদ্যালয়টি দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। শুক্রবার অনুষ্ঠিত বসন্তকালীন সমাবর্তনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধির হাতে সম্মানসূচক ডিগ্রি তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে তাদের স্মরণে দুটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়েছিল। সেই দৃশ্য উপস্থিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ এপ্রিল। ওই দিন থেকেই নিখোঁজ ছিলেন জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। তাদের সহপাঠীরা প্রথমে যোগাযোগ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে শুরু হয় অনুসন্ধান। আট দিন পর ২৪ এপ্রিল উদ্ধার করা হয় লিমনের মরদেহ। এরপর কয়েকদিনের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৩০ এপ্রিল শনাক্ত করা হয় বৃষ্টির মরদেহ।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে লিমনের রুমমেট Hisham Abugarbieh-কে। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতে লিমনকে হত্যা করা হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দুটি ফার্স্ট-ডিগ্রি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

হিলসবরো কাউন্টি আদালতে দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নৃশংস এবং পূর্বপরিকল্পিত। দেশটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ১৮ মে স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। মামলার প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন লিঞ্জি হোজেস। তাকে সহায়তা করবেন স্কট হারমেন, জন টেরি এবং জেসিকা কোভারটিয়ার।

এদিকে দেশে বৃষ্টি ও লিমনের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। তাদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তার বিষয়েও আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বৃষ্টির সহপাঠীরা বলছেন, তিনি শুধু একজন মেধাবী গবেষকই ছিলেন না, বরং সবার প্রিয় একজন মানুষও ছিলেন। সবসময় হাসিখুশি থাকা এই তরুণী বন্ধুদের অনুপ্রেরণা জোগাতেন। তার মৃত্যুতে তারা যেন নিজেদের একজন আপনজনকে হারিয়েছেন।

ঢাকার আকাশে শনিবার সকালের আলো ফুটলেও বৃষ্টির পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। যে মেয়ে একদিন ডিগ্রি হাতে দেশে ফিরবে বলে স্বপ্ন দেখেছিল, সে ফিরল কফিনে। বিমানবন্দরের সেই মুহূর্ত যেন বাংলাদেশের অসংখ্য স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে এক গভীর বেদনার চিহ্ন হয়ে রইল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত