ট্রাম্পের উদ্যোগে ৩ দিনের যুদ্ধবিরতি রাশিয়া-ইউক্রেনে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
ট্রাম্পের উদ্যোগে ৩ দিনের যুদ্ধবিরতি রাশিয়া-ইউক্রেনে

প্রকাশ: ৯ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে তিন দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump শুক্রবার (৮ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন যে, রাশিয়া ও ইউক্রেন ৯ মে থেকে ১১ মে পর্যন্ত সাময়িক যুদ্ধবিরতি পালনে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহুবার যুদ্ধবিরতির আলোচনা হলেও, সাম্প্রতিক এই সমঝোতাকে কূটনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প তার ঘোষণায় বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয় দিবসকে সামনে রেখেই এই যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ায় ৯ মে ‘ভিক্টরি ডে’ বা বিজয় দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। একইভাবে ইউক্রেনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্মৃতি স্মরণ করে থাকে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে রাশিয়া ও ইউক্রেন আগামী তিনদিন যুদ্ধবিরতি পালন করবে। এই সময়টিকে আমরা ইতিহাসের স্মৃতি ও মানবতার স্বার্থে শান্তির সূচনা হিসেবে দেখতে চাই।”

এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার অংশ হিসেবেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। জেলেনস্কি বলেন, “যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রতি ইউক্রেন ইতিবাচক। এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।”

অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর সহকারী ইউরি উশাকভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের সময় এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। একইসঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিরা কিয়েভের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তার দাবি, সম্প্রতি পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে হওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মিত্রতার ইতিহাস এবং বিজয় দিবসের আবেগকে সামনে রেখে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পূর্ব ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ বেড়ে যায় এবং রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণও তীব্র আকার ধারণ করে। এতে উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে এবং নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে ইউরোপজুড়ে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির এই তিনদিনে রাশিয়া ও ইউক্রেন সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ রাখবে। পাশাপাশি উভয় দেশ এক হাজার করে যুদ্ধবন্দি মুক্তি দিতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বন্দি বিনিময়কে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও, এত বড় আকারে বন্দি মুক্তির সিদ্ধান্ত এই প্রথম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল মানবিক পদক্ষেপ নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে ন্যূনতম আস্থার পরিবেশ তৈরিরও ইঙ্গিত।

ট্রাম্প তার পোস্টে আরও বলেন, “আমি আশা করছি এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও কঠিন সংঘাতের অবসানের সূচনা করবে।” তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষকেই এই উদ্যোগে সম্মত হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ট্রাম্পের এই ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতার অংশমাত্র।

রাশিয়া এর আগে একতরফাভাবে বিজয় দিবস উপলক্ষে দুই দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। তবে ইউক্রেন অভিযোগ করেছিল, তাদের পক্ষ থেকেও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হলেও মস্কো তখন তা গুরুত্ব দেয়নি। ফলে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততায় হওয়া সমঝোতাকে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার পর থেকে ইউরোপের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। মস্কোর দাবি ছিল, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টা এবং পশ্চিমা সামরিক জোটের সম্প্রসারণ তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল। পাশাপাশি ২০১৫ সালের মিনস্ক চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতির প্রশ্নেও দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই শুরু হয় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ।

এই সংঘাতের ফলে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি। যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই; বিশ্বজুড়ে খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বাজারেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন দিনের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা না দিলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতা, যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের সিদ্ধান্ত এবং উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক সম্মতি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলেও সতর্ক করছেন পর্যবেক্ষকরা। অতীতেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর একে অপরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে এবারের সমঝোতা কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তারপরও যুদ্ধক্লান্ত সাধারণ মানুষের কাছে এই তিন দিন নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপে বসবাস করা পরিবারগুলো, সীমান্তে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করা মানুষ কিংবা যুদ্ধের ভয়াবহতায় ক্ষতবিক্ষত রুশ ও ইউক্রেনীয় নাগরিকদের জন্য এই যুদ্ধবিরতি অন্তত কিছুটা স্বস্তির সুযোগ এনে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন একটাই—এই তিন দিন কি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ হয়ে উঠবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত