প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব যখন এখনো কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘ ছায়া পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ঠিক তখনই নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হান্টাভাইরাস। আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলরত একটি বিলাসবহুল ডাচ প্রমোদতরীতে ভাইরাসটির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতোমধ্যে তিনজনের মৃত্যু এবং একাধিক সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর জাহাজটিতে থাকা আমেরিকান যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইটের ব্যবস্থা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর শুক্রবার (৮ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আক্রান্ত জাহাজটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা জাহাজে থাকা আমেরিকানদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কাজ করছি এবং এ জন্য একটি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, পুরো প্রক্রিয়ায় স্পেন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ফেডারেল সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র দফতরের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জাহাজটিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জাহাজটি স্পেনের Tenerife দ্বীপে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই কনস্যুলার সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, এমভি হন্ডিয়াস নামের বিলাসবহুল এই জাহাজটি গত মাসে আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর Ushuaia থেকে যাত্রা শুরু করে। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম কয়েকটি দ্বীপে ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল জাহাজটির। যাত্রাপথে প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য নিয়ে এটি পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল অতিক্রম করছিল। কিন্তু মাঝপথেই কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
পরে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, জাহাজটিতে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত পাঁচটি সংক্রমণের তথ্য নিশ্চিত করেছে World Health Organization। আক্রান্তদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে এক ডাচ দম্পতি এবং একজন জার্মান নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য পরিস্থিতিকে নতুন কোনো বৈশ্বিক মহামারির সূচনা হিসেবে দেখছে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ধরনের হান্টাভাইরাস সাধারণত ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে কোভিড-১৯-এর মতো দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আপাতত কম। তবে ভাইরাসটির সুপ্তিকাল বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। অর্থাৎ এখন যাদের মধ্যে উপসর্গ নেই, তাদের মধ্যেও পরে সংক্রমণ শনাক্ত হতে পারে।
এই সতর্কবার্তার পর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব যাত্রী হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার আগেই জাহাজ থেকে নেমে গিয়েছিলেন, তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটির বিস্তার সীমিত রাখতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এমভি হন্ডিয়াস পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপ রাষ্ট্র Cape Verde-এর রাজধানী Praia উপকূল অতিক্রম করে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করছে। জাহাজটিতে অন্তত ১৭ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় তাদের দ্রুত সরিয়ে নিতে চায় ওয়াশিংটন।
তবে জাহাজটির ক্যানারি দ্বীপে নোঙর করার পরিকল্পনা স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের নেতা Fernando Clavijo প্রকাশ্যে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এখনো জানি না আমরা কীসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া জাহাজটিকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশ করতে দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ।”
তিনি এ বিষয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী Pedro Sánchez-এর সঙ্গে জরুরি বৈঠকেরও অনুরোধ জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, জাহাজটি দ্বীপে নোঙর করলে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাহাজটিকে তেনেরিফে নোঙরের অনুমতি দেয়া হবে। স্পেনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম টিভিই বলেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান ও ক্যানারি দ্বীপ প্রশাসনের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলিও সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে।
প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতারা অভিযোগ করেছেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সরবরাহ করা হয়নি। তাদের দাবি, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেয়া জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস নতুন কোনো ভাইরাস নয়। সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। তবে কিছু বিশেষ ধরনের হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। সংক্রমণের লক্ষণ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুসে জটিলতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও সমুদ্রপথে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিলাসবহুল প্রমোদতরীগুলোতে হাজারো যাত্রী একসঙ্গে ভ্রমণ করায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কোভিড মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বিভিন্ন দেশ আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে চাইছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একইসঙ্গে যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই হান্টাভাইরাস কি সীমিত পরিসরেই থেমে যাবে, নাকি সামনে আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে?