প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের চাপের মধ্যে নতুন করে বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে Bangladesh Bank। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ নীতিসহায়তা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এই সুবিধার আওতায় মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়েই খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বিভিন্ন কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ঋণ নিয়মিত হওয়ার পর শুরুতে দুই বছর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে বিরতি সুবিধাও পাবেন গ্রাহকরা। ফলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তির সময় পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, যারা আগে বিশেষ নীতিসহায়তার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করেছেন, তারা এই নতুন সুবিধা পাবেন না। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত যেসব ঋণ খেলাপি হয়েছে, কেবল সেসব ঋণের ক্ষেত্রেই এই সুযোগ প্রযোজ্য হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা নিতে চাইলে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংকগুলোকে তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চালু হওয়া বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধাকে নতুনভাবে কার্যকর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, গ্রাহকরা চাইলে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগও নিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ঋণ শোধের জন্য এক বছর সময় দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আলাদা কোনো অনাপত্তি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তবে নীতিসহায়তার আওতায় জমা দেওয়া অর্থ বা ডাউন পেমেন্টের চেক নগদায়নের পর থেকেই তিন মাসের সময় গণনা শুরু হবে।
ঋণ পুনঃতফসিলের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জন্যও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বলা হয়েছে, এসব ঋণের বিপরীতে যথাযথ নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রকৃত আদায় ছাড়া আগের সুনির্দিষ্ট প্রভিশনকে আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। অর্থাৎ শুধু কাগজে-কলমে ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে শক্তিশালী দেখানোর সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এছাড়া পুরো ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে নতুন কোনো ঋণসুবিধা না দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ হলেও ব্যাংক খাতে নতুন ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই উদ্যোগকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করা জরুরি বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির জটিলতা স্পষ্ট করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। তবে বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে ডিসেম্বর শেষে তা কমে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমেছে।
এতে খেলাপি ঋণের হারও ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে আসে। যদিও অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই কমে যাওয়া প্রকৃত অর্থে ব্যাংক খাতের সুস্থতার প্রতিফলন নয়; বরং পুনঃতফসিলের সুযোগের মাধ্যমে সাময়িকভাবে হিসাবের ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। ব্যাংকারদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে S Alam Group, Beximco Group, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হল-মার্ক গ্রুপের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর নাম বারবার সামনে এসেছে।
এছাড়া Basic Bank, Islami Bank Bangladesh PLC এবং ন্যাশনাল ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে সংঘটিত বড় ধরনের কেলেঙ্কারিও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ইসলামি ধারার বেশ কয়েকটি ব্যাংক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিয়মের শিকার হয়েছে। একইসঙ্গে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল তদারকির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ শুরু হলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে আসে। অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বা ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে হঠাৎ করেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের পথ খুলে দেওয়া হয়। তখন প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠী এই সুবিধা নিয়ে ঋণ নিয়মিত করে নেয়।
তবে এই ধরনের সুযোগ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বারবার বিশেষ সুবিধা দিলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা নিরুৎসাহিত হন এবং ব্যাংক খাতে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ সুদের চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে। তাই পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুটা ছাড় প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই সিদ্ধান্ত দেশের ব্যাংক খাত ও ব্যবসা পরিবেশে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই সুযোগ সত্যিকার অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে কি না, নাকি এটি আবারও খেলাপি সংস্কৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।