প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে United States। ইরানের অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচিতে সহায়তার অভিযোগে ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন অর্থ বিভাগ। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চীন, হংকং, দুবাই ও বেলারুশভিত্তিক কয়েকটি কোম্পানিও রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের জন্য অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করেছে, যা ব্যবহার করা হচ্ছে শাহেদ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে।
মার্কিন অর্থ বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান যেন তাদের সামরিক শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। বিবৃতিতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বর্তমান নিষেধাজ্ঞার বাইরে ভবিষ্যতেও আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং এটি ইরানের সামরিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্ককে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ইরানের অগ্রগতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনভিত্তিক ইয়ুশিতা সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কোম্পানি, দুবাইভিত্তিক এলিট এনার্জি এফজেডসিও, হংকংভিত্তিক এইচকে হেসিন ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি, বেলারুশভিত্তিক আর্মারি অ্যালায়েন্স, হংকংয়ের মুস্তাদ লিমিটেড, ইরানভিত্তিক পিশগাম ইলেকট্রনিক সাফেহ এবং চীনের হিটেক্স ইনসুলেশন নিংবো। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরান বিভিন্ন ধরনের সামরিক কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সংগ্রহ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন উৎপাদন কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কিছু উপাদান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে গোপনে সংগ্রহ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের মতে, এই নেটওয়ার্ক শুধু অস্ত্র উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই নিষেধাজ্ঞা এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump কয়েক দিনের মধ্যেই চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন। সফরে তার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping-এর বৈঠকের কথা রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ বেইজিংয়ের জন্যও একটি কূটনৈতিক বার্তা। কারণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চীনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। যদিও চীন বরাবরই ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বৈধ বলে দাবি করে আসছে।
মার্কিন অর্থ বিভাগ আরও জানিয়েছে, অবৈধ ইরানি বাণিজ্যে সহায়তাকারী যেকোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে উড়োজাহাজ সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এমনকি চীনের তথাকথিত ‘টি পট’ নামে পরিচিত ব্যক্তিমালিকানাধীন তেল শোধনাগারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় ইরানের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আগে থেকেই ছিল। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান Strait of Hormuz বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জেরে তেহরানের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক দেশ বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত Centre for Information Resilience জানিয়েছে, ইরান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ড্রোন প্রস্তুতকারী দেশ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এসব ড্রোনের একটি অংশ সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে এখনো নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে অতীতে তেহরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ’ ও ‘রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেন, তাদের সামরিক কর্মসূচি আত্মরক্ষার জন্য এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই নতুন নিষেধাজ্ঞা কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, নাকি এটি তেহরানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করবে। একইসঙ্গে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিতও দেখছেন অনেকে।
বিশ্ব রাজনীতির এই জটিল সমীকরণে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন আর কেবল আর্থিক চাপের বিষয় নয়; বরং এটি কৌশলগত আধিপত্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। আর সেই বাস্তবতায় ইরানকে ঘিরে নতুন এই নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও বড় উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।