প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ–এর নতুন ধরনের ফার্স্ট পারসন ভিউ প্রযুক্তিনির্ভর ড্রোন কৌশল ইসরাইলের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আধুনিক জ্যামিং প্রযুক্তি ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এসব ড্রোন মোকাবিলায় কার্যকরভাবে সফল হতে পারছে না ইসরাইলি বাহিনী।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ বর্তমানে এমন ড্রোন ব্যবহার করছে যেগুলো ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তির কারণে ড্রোনগুলো কোনো রেডিও সংকেতের ওপর নির্ভরশীল নয়, ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সংকেত বাধাদানকারী ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই ধরনের ড্রোন অত্যন্ত স্বল্প উচ্চতায় উড়তে সক্ষম এবং সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। এতে অপারেটর সরাসরি ক্যামেরার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু দেখতে পারেন এবং মুহূর্তের মধ্যে আঘাতের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন ধরনের নির্ভুলতা তৈরি করছে।
গত রোববার উত্তর সীমান্তে একটি ঘটনায় এই ড্রোন প্রযুক্তির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর একটি ফার্স্ট পারসন ভিউ ড্রোন ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম–এর একটি ব্যাটারিতে আঘাত হানে। পরবর্তীতে হিজবুল্লাহ ওই হামলার ভিডিও প্রকাশ করে, যা সামাজিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই ঘটনার পর ইসরাইলি সামরিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ আয়রন ডোম দীর্ঘদিন ধরে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে অত্যন্ত সফল একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হলেও ছোট আকারের এবং স্বল্প উচ্চতায় উড়ন্ত ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ফার্স্ট পারসন ভিউ ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তিতে অপারেটর সরাসরি ড্রোনের চোখে যুদ্ধক্ষেত্র দেখতে পান, ফলে লক্ষ্য নির্ধারণ ও আঘাত হানা অনেক বেশি নির্ভুল হয়। এর ফলে কম খরচে উচ্চমাত্রার ক্ষতি করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তারা বিভিন্ন উন্নত সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নতুন ধরনের প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবানন সীমান্ত পরিদর্শনের সময় ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, ড্রোন প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তন তাদের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তারা জানান, ভবিষ্যতে এই হুমকি আরও বাড়তে পারে এবং সে অনুযায়ী প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর এই ড্রোন কৌশল মূলত কম খরচে উচ্চ প্রভাব তৈরি করার একটি যুদ্ধ কৌশল। এতে বড় ধরনের সামরিক অবকাঠামো ছাড়াই সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের চাপে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। এটি আধুনিক অসম যুদ্ধ কৌশলের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরাইলি পক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রোন হামলার ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সামরিক সূত্রগুলো বলছে, সীমান্ত অঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নত করার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে ছোট আকারের ড্রোন প্রযুক্তির বিস্তার ভবিষ্যতে যুদ্ধের ধরন সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিতে পারে।
তাদের মতে, প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক না কেন, নতুন ধরনের স্বল্প খরচের ড্রোন প্রযুক্তি মোকাবিলায় আলাদা কৌশল প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোর জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এদিকে সীমান্ত অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা স্থানীয় জনগণের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত সংঘর্ষ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে ফার্স্ট পারসন ভিউ ড্রোন প্রযুক্তির উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আনছে। হিজবুল্লাহর এই কৌশল ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধনীতিতে প্রযুক্তির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।