প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বাজারে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস। একসময় যেসব দেশ ছিল বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস, সেই বাজারগুলো এখন সংকুচিত হয়ে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। ফলে হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের জীবন যেমন অনিশ্চয়তায় পড়েছে, তেমনি দেশের বৈদেশিক আয়ের ওপরও তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা মোহাম্মদ মোরশেদের গল্প এখন অনেক প্রবাসীর প্রতিচ্ছবি। চার বছর আগে আশা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান তিনি। দুবাইয়ের একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি করে ভালোভাবেই চলছিল তার পরিবার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ করেই সব বদলে যায়। রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
মোরশেদ জানান, পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত বদলে যায় যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার পর মালিক কর্মীদের ছুটি দিয়ে দেয়। দেশে ফিরে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার। যে আয়ের ওপর পুরো পরিবার নির্ভর করত, সেটিও এখন বন্ধ।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে বড় একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ বিদেশে কাজের জন্য গেছেন, যাদের বড় অংশই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সেই সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান মনে করেন, এই সংকট সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় নতুন কর্মী যাওয়ার সুযোগ কমছে, আবার যারা আছেন তাদেরও কাজ হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েত অন্যতম। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই দেশগুলোর অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রবাসী কর্মসংস্থানও সংকুচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অস্থিরতা বাড়ায় জ্বালানি ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সেবা খাতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভরসা রেমিট্যান্স। এই প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদি ধস নামলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, এখনই বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি না করলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে।
অন্যদিকে সরকার পরিস্থিতি স্বীকার করে বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে এবং বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে দক্ষ কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে সেখানে অন্তত এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রোমানিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া ও সেশেলসসহ বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাজার খুঁজলেই হবে না, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের প্রস্তুত করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় কম।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় অনেকেই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে মানবপাচার ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। একদিকে হাজারো প্রবাসীর জীবন ও জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রেমিট্যান্সেও চাপ তৈরি হয়েছে। এখনই কার্যকর বিকল্প বাজার ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারলে এই সংকট আরও দীর্ঘমেয়াদি আকার নিতে পারে।