প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। গত কয়েক বছরের টানাপোড়েন, পাল্টাপাল্টি শুল্ক আর রাজনৈতিক অনাস্থার মধ্যেও সাম্প্রতিক এক শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তির দিকে গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল ও অস্থির রয়ে গেছে।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠকের পর দুই দেশ বাণিজ্যযুদ্ধে এক বছরের জন্য একটি অঘোষিত বিরতি দেয়। ওই সময় ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘ উত্তেজনার পর হয়তো সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই বৈঠক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করলেও মৌলিক সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদের আগে এই হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে শুল্কের এই বৃদ্ধি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর চীনের আরোপিত শুল্কও বহুগুণ বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চীনের গড় শুল্ক হার এখন প্রায় ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নীতির কারণে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শুল্ক যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও গভীরভাবে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বৈঠকের পর যে সাময়িক বিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তা মূলত উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো প্রবল। প্রযুক্তি, কাঁচামাল, কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প—সব ক্ষেত্রেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও রাজনৈতিক টানাপোড়েন সেই সম্পর্ককে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভোক্তা বাজারেও সরাসরি প্রভাব পড়েছে। আমদানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ ভোক্তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি উৎপাদন খাতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
চীনের ক্ষেত্রে এই শুল্ক বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি নির্ভর শিল্প খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরাও চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়ছেন। ফলে দুই দেশই এক ধরনের অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিরতি দুই দেশের জন্য কিছুটা স্বস্তি আনলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি একটি সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে উভয় পক্ষ সময় নিচ্ছে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য।
বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর নিয়ন্ত্রণ, এবং কৌশলগত শিল্প খাত নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্ব আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এই বাণিজ্য উত্তেজনাকে আরও গভীর করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এই শুল্ক যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতিতেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমানো সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার কাঠামো এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ এখন আর শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিরতি সেই উত্তেজনায় সামান্য শীতলতা আনলেও, মূল সংকট এখনো বহাল রয়েছে।