বিশ্ববাজারে তেলের দামে আবার পতন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
বিশ্ববাজার তেলের দাম পতন

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে আবারও পতন দেখা গেছে। টানা তিন দিনের ঊর্ধ্বগতির পর বুধবার (১৩ মে) বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম একযোগে কমে যায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে বাজারে প্রভাব ফেলছে। এসব কারণেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রতিফলন পড়েছে তেলের দামে।

বুধবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০৬ দশমিক ৩০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে দাঁড়ায়। যদিও আগের তিন দিন ধরে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল, তবে নতুন করে সরবরাহ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সেই গতি থামিয়ে দিয়েছে।

Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশের পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য ব্যাঘাতও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।

গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর আগে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলে বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দরপতন দেখাচ্ছে যে বাজার এখনো স্থায়ী দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে না।

ফিলিপ নোভার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেভা বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা এখনো বাজারকে সমর্থন দিচ্ছে, তবে স্পষ্ট কোনো স্থিতিশীলতা না থাকায় বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় রয়েছেন। তার মতে, প্রতিটি নতুন রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, যা তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামার কারণ হচ্ছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কোনো সংকট তৈরি হয়, তাহলে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুটোই আবার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান দরপতনকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে না দেখে সাময়িক সংশোধন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবারই তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের অবনতির কারণে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালির প্রবেশাধিকার আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই চাপ কাটতে না কাটতেই আবার পতনের ধারা শুরু হলো।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে তেলের বাজার মূলত দুই ধরনের শক্তির মধ্যে দোলাচলে রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সরবরাহ সংকট দাম বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা দাম কমানোর চাপ তৈরি করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে কেন্দ্র করেও বাজারে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার সূচনা হয়েছে। চীন বর্তমানে ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলোর একটি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের যেকোনো পরিবর্তন বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করে বরং নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ সরাসরি বন্ধ না হলেও অনিশ্চয়তা বেড়ে যাচ্ছে, যা বাজারকে অস্থিতিশীল রাখছে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং ইতোমধ্যে বিদ্যমান ঘাটতির কারণে চলতি বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, উচ্চ তেলের দাম যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতিগুলোর ভোক্তা ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

উচ্চ সুদের হার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত জ্বালানি চাহিদা কমাতে পারে। ফলে তেলের বাজারে ভবিষ্যতে চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিক থেকেই নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ববাজারে এই ওঠানামার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে এগোয়। এসব বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভূরাজনৈতিক নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে তেলের দাম শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সরাসরি প্রতিফলন হিসেবেও কাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত