জাবিতে এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
জাবিতে এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা,

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল ও আল-বেরুনী হলের সম্প্রসারিত অংশ সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বুধবার আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর থেকেই ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ওই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের একটি সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। প্রথমদিকে বিষয়টি তিনি বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছানোর পর অভিযুক্ত ব্যক্তি হঠাৎ তার গলায় রুমাল বা দড়ির মতো কিছু পেঁচিয়ে তাকে জোরপূর্বক টেনে পাশের ঝোপ ও জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়।

সেই মুহূর্তে ক্যাম্পাসের নির্জন পরিবেশে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন ভুক্তভোগী। ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন শিক্ষার্থী ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। চিৎকার শুনে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যান। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা জঙ্গলের পাশে আতঙ্কিত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ওই নারী শিক্ষার্থীকে দেখতে পান। তার শরীর ও পোশাকে মাটি লেগে ছিল এবং পায়ে স্যান্ডেলও ছিল না বলে জানান উদ্ধারকারীরা।

উদ্ধারের পরপরই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অফিসে জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপত্তা কর্মকর্তা, প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে ভুক্তভোগীকে মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একইসঙ্গে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজন সন্দেহভাজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীও তাকে শনাক্ত করেছেন বলে জানান তিনি। প্রক্টরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় মামলা দায়েরের পর তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। ১০ সদস্যের একটি দল ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি র‌্যাব সদস্যরাও তদন্তে সহায়তা করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জন সড়ক, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নিরাপত্তা টহলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকেই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত অপরাধীকে গ্রেপ্তার এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা নয়, বরং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাবোধের ওপর আঘাত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো সাধারণত মুক্তচিন্তা, নিরাপদ চলাচল এবং মানসিক স্বস্তির জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি মানসিক চাপ ও আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে কেবল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনাও জরুরি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অতীতেও বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনায় এসেছে। ক্যাম্পাসের বিস্তৃত এলাকা, নির্জন রাস্তা এবং রাতের পরিবেশকে কেন্দ্র করে নানা উদ্বেগের কথা আগে থেকেও বলা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত টহল, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সহপাঠীরা। অনেকেই বলেছেন, এমন ঘটনার পর একজন শিক্ষার্থীর জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সহপাঠী ও সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে তাকে প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার।

ঘটনার তদন্ত চলমান থাকলেও পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ঠিক কতটা নিরাপদ?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত