পদ্মা ব্যারেজে মিলল চূড়ান্ত অনুমোদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
পদ্মা ব্যারেজে মিলল চূড়ান্ত অনুমোদন

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নানামুখী আলোচনা এবং একাধিকবার উপস্থাপনের পর অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে দেশের বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বুধবার প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, নদী ও জনজীবনের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হলেও পদ্মা ব্যারেজ ছিল সবচেয়ে আলোচিত। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও প্রকল্পটি একনেকে উঠেছিল, তবে তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এবার সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনুমোদন পাওয়ায় বহু বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি ঘটল।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও পানিসংকট মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

একনেক সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। বিশেষ করে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, মাগুরা ও বরিশাল অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়া বহু নদী আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ। ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত ওই ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার বিপুল পরিমাণ পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশের অংশে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। বছরের পর বছর ধরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রায়।

পানিবিশেষজ্ঞদের মতে, গড়াই, মধুমতি, চন্দনা, বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়ালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে কৃষিজমিতে সেচ সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে লবণাক্ততা বাড়তে থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও এর ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারেজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শাখা নদীতে প্রবাহ বাড়ানো হবে। এতে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে, কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে। মৎস্যসম্পদও নতুন করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক পানি রাজনীতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়ন নিয়ে ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বাংলাদেশের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে, তা মোকাবিলায় নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প কেবল পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে খরা ও লবণাক্ততা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নদীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

স্থানীয় কৃষকরাও প্রকল্পটি নিয়ে আশাবাদী। কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে অনেক সময় ফসল চাষ কমিয়ে দিতে হয়। সেচের জন্য গভীর নলকূপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা মনে করছেন, পদ্মা ব্যারেজ চালু হলে কৃষিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

একই সঙ্গে পরিবেশবিদরাও বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। লবণাক্ততা কমলে বনাঞ্চলের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। নদীভিত্তিক অর্থনীতি ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাও নতুন করে সক্রিয় হতে পারে।

তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, সময়মতো কাজ সম্পন্ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে অনুমোদিত ব্যয় ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও পরবর্তী ধাপগুলো বাস্তবায়নে আরও বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কাজ করা হবে। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যারেজ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নদী খনন, সংযোগ খাল উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি কৌশলগত পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সফলভাবে প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এটি বাংলাদেশের নদী ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে নতুন শক্তি দেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত