প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান আবারও রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় নতুন করে চাপে পড়েছে ভারতের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল ও খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রায় পরিণত হয়েছে ভারতীয় রুপি। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বুধবার (১৩ মে) ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৭৯ রুপিতে। এর আগের দিনও রুপি রেকর্ড পতনের মুখে পড়ে ৯৫ দশমিক ৭৩–এ নেমেছিল। মাত্র একদিনের ব্যবধানে নতুন নিম্নমুখী রেকর্ড তৈরি হওয়ায় ভারতের আর্থিক বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রুপির এই ধারাবাহিক দরপতনের পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের কারণই কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতের আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় ভারতের অর্থনীতিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্বের বড় অংশের অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ পড়ে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi কয়েকদিন আগেই বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সেই উদ্বেগকেই আরও বাস্তব করে তুলছে।
রয়টার্সের জরিপে বলা হয়েছে, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ এবং আমদানিকারকদের হেজিং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রুপির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও তীব্র হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রুপির মান কমে যাওয়ার ফলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কাঁচামাল এবং বিদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারত সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপা আমদানিতে কর বাড়ানো হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস পায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সমাধান নয়।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রাবাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশের মুদ্রাই চাপের মুখে রয়েছে। তবে এশিয়ার মধ্যে ভারতীয় রুপির বর্তমান অবস্থান সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলেই উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ী মহলেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আমদানিকারকরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে রুপির মান কমে যাওয়ায় পণ্য আমদানির খরচ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, তাহলে রুপির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে, যা ভারতের শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
তবে ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে দেশটির আর্থিক মহল। বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করা হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভারতীয় রুপির রেকর্ড পতন শুধু একটি মুদ্রার সংকট নয়, বরং এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত বহন করছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি এখন একটি কঠিন সময় পার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।