হাম টিকার বদলে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন, তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্ট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
হাম টিকা ভুল প্রয়োগ তদন্ত

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক শিশুকে হামের টিকার পরিবর্তে ভুলবশত জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন প্রয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। ঘটনাটিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার গুরুতর ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করে আদালত বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছেন। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারকে কেন ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার (১৩ মে) দুপুরে। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতের নজরে এলে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতের এই পদক্ষেপকে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৪ মাস বয়সি এক শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতার কারণে শিশুটিকে ভুল করে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যবহৃত র‍্যাবিক্স ভ্যাকসিনের দুই ডোজ প্রয়োগ করা হয়। টিকা দেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিষয়টি প্রথমে স্থানীয়ভাবে গোপন থাকলেও পরে তা প্রকাশ্যে আসে এবং এলাকায় চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

শিশুটির পরিবার দাবি করেছে, টিকা প্রয়োগ করেন স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম, যাকে মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য পরিদর্শক নুরুল ইসলাম নুরুর স্থলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান আজাদের নির্দেশে পিআরএল-এ থাকা একজন কর্মীকে ডেকে এনে টিকা দেওয়া হয়। এই প্রশাসনিক অগোছালো ব্যবস্থাপনাই ভুল টিকা প্রয়োগের পেছনে অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঘটনার পর হাসপাতালে উপস্থিত অন্যান্য রোগী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাদের শিশুদের টিকা নেওয়া নিয়ে দ্বিধা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্থানীয়রা জানান, একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমন ভুল চিকিৎসা প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রিটকারীদের পক্ষের আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব সাংবাদিকদের বলেন, আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। শিশুটির সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়েও রুল জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তদারকি ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে এটি মানবিক ভুল না প্রশাসনিক অবহেলা—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান ও টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া, যেখানে সামান্য ভুলও গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই প্রতিটি ধাপে প্রশিক্ষিত জনবল, কঠোর তদারকি এবং স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা এবং জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। ভুল প্রয়োগ হলে তা শিশুর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সঠিক পর্যবেক্ষণে থাকলে অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।

এই ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে অনেকে দায়ীদের দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে শিশুটির চিকিৎসা পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে এমন ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর রেজিস্ট্রেশন ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে এ ধরনের ভুল অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

ঘটনাটি এখন শুধু একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। আদালতের নির্দেশনা ও তদন্ত প্রতিবেদনই এখন নির্ধারণ করবে, এই ঘটনায় আসলে কারা দায়ী এবং কীভাবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত