প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট বিভাগজুড়ে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। পরিবহন খাতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের আশঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট বিভাগীয় কমিটি এই সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার সন্ধ্যায় দক্ষিণ সুরমার বাবনা পয়েন্টে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় শ্রমিক নেতারা কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন।
শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর মতবিনিময় সভার পর এই সিদ্ধান্ত আসে। সভায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি না করার আশ্বাস দেওয়া হলে শ্রমিক সংগঠন কর্মবিরতি থেকে সাময়িকভাবে সরে আসে।
ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৯ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা অনির্দিষ্টকালের পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি আগামী ৬ জুন পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এর ফলে আপাতত সিলেট বিভাগের গণপরিবহন চলাচলে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ঘটছে না বলে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে শ্রমিকদের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংঘর্ষে আহত দুই শ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কয়েকজন শীর্ষ নেতা আসামি হন।
মামলায় সংগঠনের সভাপতি হাজী ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, সাবেক কোষাধ্যক্ষ সামছুল হক মানিক এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নুর মিয়াসহ কয়েকজন শ্রমিক নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। শ্রমিক নেতারা শুরু থেকেই এই মামলাকে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা দাবি করে আসছেন।
পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, ঘটনার প্রকৃত তদন্ত না করেই একপক্ষীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা দাবি করেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। এ অবস্থায় মামলার প্রতিবাদে এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত ১৪ মে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভা থেকে ১৯ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘোষণার পর সিলেটজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি শুরু হলে সিলেট বিভাগের অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে যাতায়াতকারী মানুষ বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে পারতেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উদ্যোগ নেয় শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার। রোববার অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী শ্রমিক নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে, মামলার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে এবং প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়া গেলে কাউকে অযথা গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না।
পরে শ্রমিক নেতারা জরুরি সভায় বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দেলোয়ার হোসেন এবং সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সজিব আলী। এতে বিভিন্ন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে নেতারা জানান, প্রশাসনের আশ্বাস এবং যাত্রীসাধারণের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই কর্মবিরতি সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তারা।
সিলেট অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি কর্মবিরতি শুধু পরিবহন খাত নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারত।
বিশ্লেষকদের মতে, সিলেট অঞ্চলে পরিবহন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেকোনো অচলাবস্থা দ্রুত জনজীবনে প্রভাব ফেলে। তাই প্রশাসন ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সংলাপ এবং সমঝোতার পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য পরিবহন সংকট আপাতত এড়ানো গেলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। মামলার তদন্ত, শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ—সবকিছু এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা।