কাতারে কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা বাংলাদেশের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
কাতার বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন এই উদ্যোগে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বাড়ছে সম্ভাবনা।

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে কারিগরি পেশায় প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে কাতার। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশটি বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

সোমবার রাজধানীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করেন কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি। বৈঠকে দুই দেশের শ্রমবাজার, দক্ষ জনশক্তি, কর্মীদের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে কাতারের শ্রমমন্ত্রী বিশেষভাবে জানান, তারা বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি, পাইপলাইন কারিগর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র প্রযুক্তিবিদ এবং ওয়েল্ডিং খাতের কর্মী নিতে আগ্রহী। কাতারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের কারণে এসব খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ ও কাতারের সম্পর্ক শুধু শ্রমবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। তিনি কাতারে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণে দেশটির সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে প্রায় চার লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাতারের বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। তারা নির্মাণ, সেবা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য পেশায় দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাতারে গেছেন। চলতি বছরে সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বর্তমানে ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫৫টি বিষয়ে এই প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কাতারের আগ্রহ বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।

বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। বর্তমানে কাতারগামী কর্মীদের জন্য ঢাকায় মাত্র একটি ভিসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীদের দীর্ঘ ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। বিষয়টি তুলে ধরে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে কাতারের ভিসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানান।

এ প্রসঙ্গে কাতারের শ্রমমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য তিনি নিজ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। এতে ভবিষ্যতে কর্মীদের ভিসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, কাতারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স, সেবাকর্মী, ধর্মীয় শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্যও বড় সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এসব পেশায় আরও জনশক্তি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

কাতারের শ্রমমন্ত্রী বাংলাদেশের কর্মীদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা কাতারের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাদের কাজের মান এবং দায়িত্ববোধ কাতারের নিয়োগদাতাদের আস্থা অর্জন করেছে।

একই সঙ্গে তিনি জানান, কাতারে অদক্ষ শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলার জন্য ইতোমধ্যে দুটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের কাজের দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এখন দক্ষ জনশক্তির চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, কারিগরি ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা, কারণ দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে। তাই দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানো হলে দেশের অর্থনীতিও আরও উপকৃত হবে।

সব মিলিয়ে, কাতারের এই আগ্রহ বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হলে একদিকে যেমন দেশের বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও আরও বিস্তৃত হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত