প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একসময় সংসার, সন্তান আর পরিবারের দায়িত্ব সামলে দিন কাটত নাফিজা বেগমের। তিন সন্তানের এই মা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে সুখেই ছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে শরীরে অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করেন তিনি। পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া, সামান্য কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, পিঠে ব্যথা এবং খাবারে অনীহা—প্রথমদিকে বিষয়গুলোকে তেমন গুরুত্ব দেননি। পরে পরিবারের পরামর্শে চিকিৎসকের কাছে গেলে ধরা পড়ে ভয়াবহ সত্য। তিনি আক্রান্ত হয়েছেন ডিম্বাশয় ক্যান্সারে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে নারীদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকি। বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের লক্ষণ স্পষ্ট না হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৮৭ জন নারীর মধ্যে অন্তত একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ডিম্বাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন। ভবিষ্যতে এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, রোগটি যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, নারীদের তলপেটের দুই পাশে থাকা ডিম্বাশয়ে যখন অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে ডিম্বাশয় ক্যান্সার বলা হয়। এটি নারীদের প্রজননতন্ত্রের একটি জটিল রোগ, যা ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের পেছনে বয়স একটি বড় কারণ। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫০ বছরের পর ঝুঁকি বাড়তে থাকে। যেসব নারীর অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয় কিংবা যাদের দেরিতে মাসিক বন্ধ হয়, তাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। পরিবারে আগে কারও ডিম্বাশয় বা জরায়ুর ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলেও সতর্ক থাকতে হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডিম্বাশয় ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর লক্ষণগুলো সাধারণ অন্যান্য শারীরিক সমস্যার মতো মনে হওয়া। পেট ফেঁপে থাকা, তলপেটে চাপ বা ব্যথা, দ্রুত পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পিঠে ব্যথা কিংবা মেনোপজের পর রক্তপাত—এসব লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগটি অনেক সময় শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে এমন উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, ডিম্বাশয় ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার এক নয়। অনেকেই এই দুই রোগকে একই মনে করেন, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। জরায়ুর মুখে ক্যান্সার হলে সেটিকে জরায়ুমুখ ক্যান্সার বলা হয়, আর জরায়ুর দুই পাশে থাকা ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার হলে সেটি ডিম্বাশয় ক্যান্সার।
বর্তমানে ডিম্বাশয় ক্যান্সার শনাক্তে আলট্রাসনোগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ক্যান্সার শনাক্তকারী বিশেষ রক্ত পরীক্ষা করা হয়, যা রোগের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, যাদের পরিবারে এ ধরনের রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত।
চিকিৎসা পদ্ধতির ক্ষেত্রে সাধারণত অস্ত্রোপচার এবং কেমোথেরাপি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। রোগের ধাপ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, আধুনিক জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং মানসিক চাপের কারণেও বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সচেতন জীবনযাপন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারীদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে যেকোনো অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যান্সার চিকিৎসার মান আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে বলেও মনে করছেন চিকিৎসকরা। দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে বিশ্বমানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে অনেক রোগী জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম্বাশয় ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ নারীরা যদি শুরুতেই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হন এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তাহলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।
নাফিজা বেগমের মতো অসংখ্য নারী প্রতিদিন নীরবে এমন ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসাই পারে এই ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।